মধ্যপ্রদেশের কাটনি রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের ভেতর থেকে আতঙ্কিত চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে বিহার থেকে মাদ্রাসায় পড়তে যাওয়া এক শিশু-কিশোর।
শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ট্রেনে করে বিহার থেকে মহারাষ্ট্রের মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে মধ্যপ্রদেশের কাটনি রেলওয়ে স্টেশনে ১৬৩ জন মুসলিম শিশু-কিশোর ও তাদের ৮ জন শিক্ষককে আটক করে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানব পাচারের আশঙ্কায় শিশু কল্যাণ কমিটির এক সদস্যের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরকারি রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরআরপি) যৌথভাবে এই পদক্ষেপ নেয়। তবে আটককৃতদের পরিবারের দাবি, প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মীয় পরিচয় ও পোশাকের কারণে তাদের সন্তানদের দীর্ঘ ১৩ দিন অবৈধভাবে আটকে রেখে চরম হয়রানি করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি যাচাই-বাছাই ও আন্দোলনের পর অবশেষে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে।
গত ১১ এপ্রিল সকাল সাতটায় পাটনা জংশন থেকে পাটনা-পুনে এক্সপ্রেসে করে ১৬৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী ও তাদের শিক্ষকরা মহারাষ্ট্রের লাতুরের একটি মাদ্রাসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। দুপুরের দিকে মুঘলসরাই স্টেশনে পুলিশ তাদের আধার কার্ড ও গ্রামপ্রধানের প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে যাত্রার অনুমতি দিলেও বিপত্তি ঘটে মধ্যপ্রদেশের কাটনি স্টেশনে। সেখানে শিশু কল্যাণ কমিটির (সিডব্লিউসি) সদস্য দুর্গেশ মারিয়ার একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো দলকে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগে দাবি করা হয়েছিল, এই শিশুদের অবৈধ কাজের জন্য বা শিশুশ্রমের উদ্দেশ্যে মহারাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আটকের পর শিক্ষার্থীদের 'জাগৃতি' নামের একটি দুই কামরার সরকারি আবাসে প্রায় ১৩ দিন রাখা হয়। কাটনি জিআরপির কর্মকর্তা এলপি কাশ্যপ জানান, "বাচ্চাদের কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। পরবর্তীতে পরিবারের পরিচয় ও সম্মতি নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের বিহারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।"
তবে কাটনি পুলিশের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগী ও মানবাধিকার কর্মীরা। ট্রেনে থাকা লাতুরের আশরাফিয়া আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক সাদ্দাম জারজিস বলেন, "আমার কাছে প্রতিটি বাচ্চার আধার কার্ড এবং বাগদহরা পঞ্চায়েতের প্রধান কুলসুম বিবির অফিসিয়াল লেটারপ্যাডের অনুমতিপত্র ছিল। সেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল যে দরিদ্র শিশুদের কল্যাণে আমি তাদের শিক্ষাদানের জন্য নিয়ে যাচ্ছি। আমার সাথে আমার স্ত্রী ও ছয় বছরের সন্তানও ছিল। তবুও আমাদের অপরাধীর মতো আটকে রাখা হলো।"
আইনজীবী ও সামাজিক সংগঠন 'জন জাগরণ শক্তি'-র কর্মী রামিজ রেজা এই ঘটনাকে ভারতের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "অভিভাবকরা স্বেচ্ছায় সন্তানদের পাঠিয়েছেন, টিকিট কেটে বৈধভাবে তারা ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন এবং মাদ্রাসার অনুমোদনপত্রও সাথে ছিল। আদালত এসব নথি যাচাই করে তাদের ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। মূলত বর্তমানে ভারতে মাদ্রাসা, দাড়ি-টুপি পরা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হচ্ছে।"
লাতুরের ওই মাদ্রাসাটির পরিচালক আজিজুর রহমান জানান, ১৯১৬ সাল থেকে পরিচালিত এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি বছরই বিহার, কর্ণাটকসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে শিক্ষার্থীরা আসে। এবার তাদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার, ইংরেজি, মারাঠি ও গণিত শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিহারের সীমান্ত লাগোয়া আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ, কাটিহার ও পূর্ণিয়া জেলাগুলোতে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং এখানকার অধিকাংশ পরিবারই চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। সরকারি স্কুলগুলোর বেহাল দশা এবং বেসরকারি স্কুলের চড়া ফি (৫ থেকে ১০ হাজার রুপি) দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় ফ্রি আবাসিক সুবিধার জন্য অভিভাবকেরা সন্তানদের দূরবর্তী রাজ্যের মাদ্রাসায় পাঠান।
আরারিয়ার বাসিন্দা ও ছয় সন্তানের জননী কিস্মতি বিবি (৫৫) তার দুই ছেলে ও এক নাতিকে উদ্ধারের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাটনিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, "ছেলেরা হাফেজ হওয়ার শেষ বর্ষের পড়াশোনা করতে যাচ্ছিল। পুলিশ তাদের ধরেছে শুনে ৬ হাজার টাকা ধার করে কাটনি আসি। পুলিশ প্রথমে দেখা করতে দেয়নি, পরে জেদ ধরে বসে থাকার পর দেখা করতে দেয়। আমাদের মতো গরিবদের এভাবে কেন হয়রানি করা হলো?" আরেক অভিভাবক কিশোওয়ার জাহান বলেন, "স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর টাকা নেই। মাদ্রাসায় তো বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। পুলিশ যদি আমাদের পড়াশোনা করতে বাধা দেয়, তবে তারাই এখানে ভালো স্কুল বা মাদ্রাসা করে দিক।"
সামাজিক সংগঠনগুলোর মতে, জুভেনাইল জাস্টিস (জেজে) আইনের অপব্যবহার করে এই শিশুদের আটকে রাখা হয়েছিল, যা স্পষ্টতই ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। মধ্যপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টির জেলা সভাপতি ড. একে খান এবং 'সর্বধর্ম সদ্ভাবনা মঞ্চ'-এর সেক্রেটারি হাজী মোহাম্মদ ইমরান হারুন যৌথ বিবৃতিতে একে 'অন্যায় ও বেআইনি হয়রানি' বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রশাসন একে 'সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ' বললেও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কিশোর শিক্ষার্থী ইরফান জানায়, "পুলিশ যেভাবে আমাদের আটকে দিল, তাতে এখন বাইরের রাজ্যে পড়তে যেতে ভয় লাগছে।" ওড়িশার কটকেও সম্প্রতি একইভাবে ৫৯ জন মুসলিম শিক্ষার্থীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়ার আরেকটি ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
