ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর হামলায় মাদকবাহী সন্দেহে একটি নৌযানে আগুন ধরে যাওয়ার দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচারকারী সন্দেহে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নৌযান ও বিমান হামলায় নিহত ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি জোটের পাঁচ মাসব্যাপী দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দীর্ঘদিনের ‘অজ্ঞাতনামা’ এই ভুক্তভোগীদের পরিচয় প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন হামলায় এ পর্যন্ত নিহত প্রায় ২০০ জনের বড় অংশই আন্তর্জাতিক মাদক সম্রাট নন; বরং তারা চরম দারিদ্র্যের শিকার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সাধারণ কর্মজীবী মানুষ।
‘লাতিন আমেরিকান সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম’ বা ক্লিপের নেতৃত্বে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও ত্রিনিদাদের ২০ জন সাংবাদিক এবং যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার সংস্থা ‘এয়ারওয়ারস’-এর যৌথ প্রচেষ্টায় এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন গত বছর থেকে ভেনেজুয়েলা ও এর আশপাশের জলসীমায় মাদকবিরোধী সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির পর থেকে এসব হত্যাকাণ্ড শুরু হয়। ওয়াশিংটন এদের ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ হিসেবে দাবি করলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিহতদের অনেকেরই মাদক পাচারের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, আর যারা জড়িত ছিলেন তারাও কেবল পরিবারের ক্ষুধা মেটাতে বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছিলেন।
অনুসন্ধানের বিষয়ে ক্লিপের পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মারিয়া তেরেসা রন্দেরোস বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র কোনো পাবলো এসকোবার বা ‘এল চাপো’ গুজমানকে খতম করছে না। বাস্তবে যা ঘটছে, তা হলো চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে বাস করা এবং পরিবারকে সহায়তার জন্য যেকোনো কাজ করতে বাধ্য হওয়া যুবকেরা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন। ওই পুরুষেরা বৈধ নাকি অবৈধ কাজ করছিলেন সেটি বড় নয়; বড় বিষয় হলো চরম দরিদ্র এই পরিবারগুলোর শিশুরা এমন একজন মানুষকে হারিয়েছে, যিনি ঘরে খাবার নিয়ে আসতেন।”
অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ভুক্তভোগীদের মধ্যে আটজন ভেনেজুয়েলার, তিনজন কলম্বিয়ার, দুজন ইকুয়েডরের, দুজন ত্রিনিদাদের এবং একজন সেন্ট লুসিয়ার নাগরিক। এদের মধ্যে ভেনেজুয়েলার লুইস আমুন্দারাইন ও হুয়ান ফুয়েন্তেস মূলত গাড়িচালক ছিলেন, যারা ত্রিনিদাদে গাড়ি ধোয়ার কাজ পেয়ে পারিয়া উপসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে একটি নৌকায় ভ্রমণের কাজ পাওয়ার পর ৩ অক্টোবর তাদের ওপর মার্কিন বোমাবর্ষণ করা হয়। নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাধারণ মৎস্যজীবীও রয়েছেন, যাদের পরিবার ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে এই সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, “সব হামলাই ছিল পরিকল্পিত, আইনসম্মত ও নির্ভুল, যা মাদক-সন্ত্রাসী ও তাদের সহযোগীদের লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে। আমাদের অভিযান এবং তথ্য সরবরাহকারী গোয়েন্দাদের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই আগ্রাসী নীতিকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক আইনজীবী ব্রায়ান ফিনুকেন এই অভিযানকে একটি রাজনৈতিক প্রদর্শনী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “এটি মূলত মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বীরত্বপূর্ণ কিছু করার একটি মোহ তৈরি করার চেষ্টা। ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান ইরান যুদ্ধের মতো নানামুখী সামরিক হঠকারিতার আড়ালে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলো যেন বিশ্ববাসীর কাছে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হিসেবে স্বীকৃতি না পায়, সে বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি।”
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
