ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতকে ‘হেলহোল’ বা ‘নরকতুল্য’ বলে অভিহিত করার ঘটনায় ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘অজ্ঞাতপ্রসূত’ ও ‘অনুপযুক্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছে ভারত। দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারিত্ব যখন এক স্পর্শকাতর সময় পার করছে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি কনজারভেটিভ পডকাস্ট উপস্থাপক মাইকেল স্যাভেজের একটি বক্তব্যের প্রতিলিপি ও ভিডিও শেয়ার করেন। ওই পোস্টে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব অধিকারের কঠোর সমালোচনা করা হয়।
ট্রাম্পের শেয়ার করা সেই পোস্টে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করা হয় যে, মার্কিন প্রযুক্তি খাতে কর্মরত ভারতীয় অভিবাসীরা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের নিয়োগ দিচ্ছেন না। এমনকি অযৌক্তিকভাবে দাবি করা হয়, ভারতীয় অভিবাসীদের ইংরেজি ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষতা নেই। সবচেয়ে আপত্তিকর অংশটি ছিল অভিবাসীদের পরিবার নিয়ে আসার প্রসঙ্গে, যেখানে বলা হয়, “এখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) জন্ম নেওয়া একটি শিশু তাৎক্ষণিক নাগরিক হয়ে যায়, আর এরপর তারা চীন বা ভারত বা এই গ্রহের অন্য কোনো ‘হেলহোল’ (নরকতুল্য) থেকে পুরো পরিবারকে নিয়ে আসে।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, “এই মন্তব্য স্পষ্টতই অজ্ঞাতপ্রসূত, অনুপযুক্ত এবং রুচিহীন। এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না।” তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন গণতান্ত্রিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
ট্রাম্পের এই উসকানিমূলক মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন আগামী মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভারত সফরের কথা রয়েছে। রুবিওর এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া শীতলতা দূর করে সম্পর্কের বরফ গলানো। বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্টের এমন বৈরী মন্তব্য রুবিওর সফরের টেবিলে অস্বস্তিকর ছায়া ফেলবে, যা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে।
কেবল ভারত সরকারই নয়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের বৃহত্তম সংগঠন ‘হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন’ এই পোস্টের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। সংগঠনটি ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে ‘ঘৃণ্য ও বর্ণবাদী’ বলে অভিহিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে এ ধরনের মন্তব্য চরম উসকানিমূলক, যা আমাদের সম্প্রদায়কে যুক্তরাষ্ট্রে বিপন্ন করে তুলবে। যখন বিদেশভীতি ও বর্ণবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠছে, তখন শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের বক্তব্য কেবল ঘৃণা ও বিভাজনই ছড়াবে।”
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন বিরোধী কঠোর অবস্থান নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বে তার মেয়াদকালেও তিনি ভারতীয় প্রযুক্তি কর্মীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এইচ-ওয়ান বি ভিসার ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছিলেন। এবারের মন্তব্য সেই পুরনো বৈরিতাকেই নতুন মাত্রায় উসকে দিল।
ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, ট্রাম্পের এই ‘নরকতুল্য’ তকমা কেবল ভারতের মর্যাদাকেই আঘাত করেনি, বরং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় দুই দেশের যে ঐকমত্য রয়েছে, তাকেও দুর্বল করে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন এই ক্ষোভ প্রশমনে কোনো গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
বিষয় : বিশ্ব সংবাদ ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ভারত
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
