ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ শান্তি আলোচনার আগে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ইসলামাবাদ, ১১ এপ্রিল ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাঠ থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যকার যুদ্ধের দামামা থামানো—গত এক বছরে বিশ্ব ভূরাজনীতির এক বিস্ময়কর নাম ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। একদিকে ভারতের সঙ্গে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মোকাবিলা, অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, পাকিস্তানের এই সামরিক প্রধান এখন কেবল ইসলামাবাদের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নন, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক অপরিহার্য ‘শান্তি দূত’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নাটকীয় মোড় নিলো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক ঘোষণায় জানান, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে তিনি ইরানে হামলা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসিম মুনিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। গত ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পর্দার আড়ালে মূল কারিগর ছিলেন মুনিরই। তিনি সরাসরি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন।
আসিম মুনিরের এই আন্তর্জাতিক ‘ম্যান অব দ্য মোমেন্ট’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে এক বছরের ঝোড়ো ঘটনাবলি। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার সূত্র ধরে ভারত ও পাকিস্তান যখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখনই পাদপ্রদীপে আসেন তৎকালীন জেনারেল মুনির। ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর জবাবে পাকিস্তানের সামরিক তৎপরতা এবং পরবর্তীতে ১০ মে ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি—এই পুরো প্রক্রিয়ায় মুনির নিজেকে একজন ‘কঠোর অথচ বাস্তববাদী’ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান (ইউএসআইপির সাবেক প্রধান) বলেন, "ট্রাম্প শক্তির ভাষা বোঝেন, আর আসিম মুনির ভারতের সঙ্গে সংঘাতে সেই শক্তিরই প্রদর্শন করেছেন। এটিই ট্রাম্পের চোখে তাঁকে একজন প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে।"
এই যুদ্ধের পরপরই পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভা মুনিরকে বিরল সম্মাননা হিসেবে ‘ফিল্ড মার্শাল’ পদে উন্নীত করে। আইয়ুব খানের পর তিনিই প্রথম এই মর্যাদা পেলেন। তবে মুনির কেবল সামরিক পদবী নয়, বরং ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদের মাধ্যমে দেশটির সামরিক বাহিনীর সকল শাখার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন।
২০২৫ সালের জুনে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে মুনিরের একান্ত মধ্যাহ্নভোজ ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। কোনো বেসামরিক নেতৃত্ব ছাড়াই একজন পাকিস্তানি সামরিক প্রধানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বৈঠক ইসলামাবাদের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। ট্রাম্প তাঁকে ‘একজন মহান যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বিশেষ করে আফগানিস্তানের ‘অ্যাবে গেট’ হামলার সন্দেহভাজনকে ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দেওয়া এবং বিরল খনিজ পদার্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে সহযোগিতার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে মুনিরের ব্যক্তিগত রসায়নকে আরও গভীর করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল-ইরান সংঘাত শুরু হলে পাকিস্তান এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে নবজাতক প্রতিরক্ষা চুক্তি, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রক্ষা। কিন্তু এই সংকটকেই সুযোগে রূপান্তর করেন আসিম মুনির। ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসার বিরল সক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি মধ্যস্থতাকারীর আসনে বসেন।
ইসলামাবাদভিত্তিক সনোবর ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমা মনে করেন, এটি কেবল ক্ষমতা কুক্ষিগত করা নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাকিস্তানকে একটি একক নেতৃত্বের ছাতার নিচে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসিম মুনিরের ভাবমূর্তি ‘শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী’র হলেও দেশের অভ্যন্তরে চিত্রটি ভিন্ন। ২০২৫ সালে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সহিংসতা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর দমন-পীড়ন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সিডিএফ পদের মাধ্যমে অর্জিত ‘আজীবন বিচারিক দায়মুক্তি’ তাঁর ক্ষমতাকে আইনগতভাবে অপ্রতিরোধ্য করলেও, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ তাঁর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
আপাতত আসিম মুনির এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যাঁর সিদ্ধান্ত কেবল ইসলামাবাদ নয়, বরং ওয়াশিংটন থেকে তেহরান পর্যন্ত ভূরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করছে। বিশ্বমঞ্চে তাঁর এই নাটকীয় উত্থান পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় পাকিস্তানের নতুন অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আর অর্থনৈতিক সংকটের চোরাবালি এড়িয়ে এই ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শাল’ কতদূর যেতে পারবেন, সময়ই তা বলে দেবে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা
বিষয় : ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ইরান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
