হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ প্রবেশপথে টহল দিচ্ছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) একটি দ্রুতগামী যুদ্ধযান।ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী ছায়াযুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী সংঘাতের পর ভূ-রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা দেখছেন, ইরানের প্রকৃত শক্তি তার বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং বিশ্বের ‘জ্বালানি ধমনী’ হিসেবে পরিচিত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। এই সরু জলপথটি ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা তেহরানকে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে এক অমোঘ দরকষাকষির হাতিয়ার এনে দিয়েছে।
সংঘাতের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, আধুনিক মার্কিন প্রযুক্তি ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের শাসনব্যবস্থা ও সামরিক কাঠামো তছনছ হয়ে যাবে। কিন্তু তেহরান তাদের প্রচলিত যুদ্ধের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে কৌশল পরিবর্তন করে। তারা তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেয় হরমুজ প্রণালিকে, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এই নড়বড়ে জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমেই ইরান মূলত পশ্চিমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শীর্ষ কর্মকর্তারা অনুধাবন করেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের চেয়েও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা বেশি ফলপ্রসূ। এটি কেবল সামরিক বিজয় নয়, বরং মার্কিন অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির পর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কুয়েতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস থেকে এক বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছে। ‘আল্লাহর সাহায্যে বিজয় অর্জিত হয়েছে’—এমন শিরোনামের বার্তায় বোঝানো হচ্ছে যে, দেশটি বিদেশি চাপ প্রতিরোধে সফল। আইআরজিসি’র উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, তাদের ‘আঙুল এখনো ট্রিগারে রয়েছে’।
তবে এই বিজয়ের উল্লাসের আড়ালে দৃশ্যপট অনেকটা ধূসর। দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। যুদ্ধের আবহে দেশটিতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা দেশের ভেতরে ভিন্নমত দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান ও উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের পার্লামেন্টের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিশন বর্তমানে এই আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাবটি পাস হলে:
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ খাতিবজাদেহ বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জলসীমা নয়, বরং এর নিরাপত্তা ও চলাচল ‘ইরান ও ওমানের সদিচ্ছার’ ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মনে করে, সমুদ্রে অবাধ চলাচল একটি মৌলিক আন্তর্জাতিক অধিকার। ফলে ইরানের এই শুল্ক আরোপের প্রচেষ্টা একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। হোয়াইট হাউস একে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই শুল্ক আদায়ে সফল হয়, তবে তা হবে তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিজয়। কিন্তু এর বিপরীতে নেটো সদস্য দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকিও থাকছে সমানভাবে।
হরমুজ প্রণালি এখন কেবল একটি জলপথ নয়, এটি ইরানের টিকে থাকার রক্ষা কবচ এবং পশ্চিমাদের জন্য এক গভীর সংকটের নাম। তেহরান যদি এই বৈশ্বিক জ্বালানি পথটিকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের ভিত্তি নড়ে উঠবে। অন্যদিকে, এই অতি-সাহসী পদক্ষেপ ইরানকে পুনরায় একটি বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে—পরবর্তী পদক্ষেপটি কি শান্তির পথ খুলবে, নাকি পারস্য উপসাগরে নতুন কোনো দাবানলের জন্ম দেবে।
বিষয় : ইসরায়েল ইরান মধ্য প্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
