গাজা সীমান্তে দাঁড়িয়ে বসতি সম্প্রসারণের স্বপ্ন দেখছে ইসরায়েলি নাগরিকরা। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর শান্তির এক ক্ষীণ আভাস মিলছে, ঠিক তখনই গাজা উপত্যকা পুনর্দখলের এক ভয়াবহ ‘শপথ’ বিশ্ববাসীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও গাজার স্থিতিশীলতা নিয়ে বিশ্ব যখন ব্যস্ত, তখন গাজা সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে পিকনিক স্পটে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা নতুন করে গাজা দখলের বিস্তারিত পরিকল্পনা করছে। কেবল গাজা নয়, তাদের এই আগ্রাসনের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার গোলান মালভূমিও।
২০২৫ সালের অক্টোবরে মার্কিন মধ্যস্থতায় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের তত্ত্বাবধানে গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে টনি ব্লেয়ার ও নিকোলাই ম্লাদেনভদের সমন্বয়ে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ গাজা পরিচালনার দায়িত্ব পালন করলেও কট্টরপন্থি ইসরায়েলিদের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গাজা সীমান্তে ‘আমাদের গাজা’ নামক লিফলেট বিতরণ করছে নতুন প্রজন্মের উগ্র জয়নবাদীরা। ১৯ বছর বয়সী নেরি আব্রাহামের মতো তরুণরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, “গাজাবাসীদের সেখানে থাকার যোগ্যতা নেই, তাদের মিসরে চলে যাওয়া উচিত।” এটি কেবল গুটিকয়েক তরুণের উন্মাদনা নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যাদের বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশে আধিপত্য রয়েছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের মতো কট্টরপন্থিদের প্রত্যক্ষ মদদে এই সম্প্রসারণবাদী আন্দোলন বেগবান হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি উদ্বোধনের সময় স্মোট্রিচ ঘোষণা দিয়েছেন, “গাজায় আমাদের সীমান্ত বিস্তৃত হবে, সিরিয়ার মাউন্ট হারমন থেকে লেবাননের লিতানি পর্যন্ত হবে আমাদের সীমানা।” পরিসংখ্যান বলছে, ইসরায়েলের ইহুদি জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ এখন এই ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠনের আন্দোলনকে সমর্থন করছে।
আইডিএফ কর্মকর্তা অ্যাভিচি গুডম্যানের ভাষায় এই মতাদর্শ আরও সরল— “যুদ্ধ মানেই জয় বা পরাজয়। গাজাবাসীকে হারাতে হলে তাদের ভূমি কেড়ে নিতে হবে।” সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের উক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা বর্তমানের এই আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বসতি স্থাপনকারীরা যখন পিকনিক স্পটে উল্লাসে মগ্ন, সীমান্তের ওপারে গাজাবাসীদের জীবন তখন ‘জীবন্ত নরক’। যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৭২০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। ৫৭ বছর বয়সী কৃষক আবু সায়েদ আল-বারোয়াই নিজের আবাদি জমি ‘ইয়েলো লাইন’-এর ওপারে রেখে ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করছেন।
উত্তর গাজার বাসিন্দা আবেদ আল-হাদি কাহমান বর্ণনা করেন শীতের সেই ভয়াবহতা— “আমাদের সন্তানদের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে আমরা তাঁবুর নিচে সংগ্রাম করছি। নিরাপত্তা নেই, শিক্ষা নেই, আমরা নিরাপদ বোধ করি না। মনে হয় না যে যুদ্ধ শেষ হয়েছে।”
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট গাজা শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়ার যেকোনো অজুহাত খুঁজবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কর্তৃক হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব হামাস সরাসরি প্রত্যাখ্যান করায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক ২১ জন নিরাপত্তা প্রধান—যাদের মধ্যে মোসাদ, শিন বেত ও আইডিএফ প্রধানরা রয়েছেন—এক যৌথ চিঠিতে সতর্ক করেছেন যে, পশ্চিম তীরে বর্তমানে ‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ’ রাষ্ট্রীয় সমর্থনে চলছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই চরমপন্থা শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল রাষ্ট্রকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গাজা সীমান্তের সেই পিকনিক স্পটে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ কেবল এক টুকরো ভূমি দখলের আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং তা হাজার বছরের পুরনো সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে নতুন করে উসকে দেওয়ার নামান্তর। একদিকে আন্তর্জাতিক শক্তির শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস, অন্যদিকে উগ্রপন্থিদের ভূমি দখলের শপথ—এই দ্বিমুখী সংঘাতের মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবন। বিশ্ব বিবেক যদি এই মুহূর্তেই কট্টরপন্থিদের এই আগ্রাসী নীল নকশা থামাতে না পারে, তবে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ কেবল ইতিহাসের পাতায় এক ব্যর্থ উদ্যোগ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
বিষয় : পশ্চিম তীর ইসরায়েল ফিলিস্তিন গাজা মধ্যপ্রাচ্য
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
