ইসলামাবাদে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। নেপথ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পদস্থ কর্মকর্তারা। ছবি: রয়টার্স
রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও বিশ্ব অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতির পাঁচ সপ্তাহ পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে বসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আজ শনিবার সকালে ইসলামাবাদের এক সুরক্ষিত ভেন্যুতে শুরু হচ্ছে এই ঐতিহাসিক বৈঠক। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি সমন্বিত হামলা এবং পরবর্তীতে হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে এই আলোচনাকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ‘সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় দুই দেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যদের দিকে তাকালে। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন খোদ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যস্থপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ সংকটের মাঝেই ইরানি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনার পর আজই সরাসরি বৈঠকে বসার সম্ভাবনা রয়েছে দু’পক্ষের।
গত পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানে অন্তত ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় দুই সপ্তাহের যে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়েছে, তার মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ এপ্রিল। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই একটি স্থায়ী সমাধান কিংবা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে পৌঁছানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বৈঠক শুরুর আগমুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, “ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র না থাকাই হবে চুক্তির মূল ভিত্তি।” ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমানো এবং অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া।
বিপরীতে, তেহরান তাদের ১০ দফা দাবিতে অটল রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি। এই বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে কোনো মধ্যপন্থা বের করাই এখন ইসলামাবাদের জন্য কঠিন পরীক্ষা।
আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একে বিশ্বশান্তির জন্য একটি ‘বড় সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজে মার্কিন প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়ে আলোচনার গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই আলোচনা সফল হয়, তবে তা কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতারই অবসান ঘটাবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের প্রভাবকেও পুনপ্রতিষ্ঠিত করবে।
ইসলামাবাদের এই আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে ২২ এপ্রিলের পর মধ্যপ্রাচ্য আবারও এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে, যার উত্তাপ ছড়াবে সারা বিশ্বে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের দিকে—যেখান থেকে হয়তো বেরিয়ে আসবে যুদ্ধের চিরস্থায়ী সমাপ্তি অথবা আরও বড় কোনো সংঘাতের পূর্বাভাস।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, দ্য ন্যাশনাল ও আল–মনিটর
বিষয় : ইরান পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
