× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

ইরান যেভাবে নাড়িয়ে দিল বৈশ্বিক অর্থনীতিকে

ন্যাশনাল ট্রিবিউন ডেস্ক

১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৪ এএম । আপডেটঃ ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫৮ এএম

হরমুজ প্রণালিতে নৌযানের ফাইল ছবি: এপি

মুক্ত বাণিজ্যের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। যেখানে কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে জ্বালানি সরবরাহ ও ভূ-কৌশলগত করিডোরের নিয়ন্ত্রণ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভঙ্গুর এক যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলেও, পর্দার আড়ালে চলমান ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ বিশ্বব্যবস্থাকে এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বমঞ্চে পরাশক্তি না হয়েও কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে নতজানু করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে ‘জিম্মি’ করার কৌশল গ্রহণ করেছে। হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রজাত তেল পরিবহনের পথ—বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিতে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি পশ্চিমা অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতিকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে।

গত বুধবার ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ট্রাম্প দাবি করেছেন যে মার্কিন সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। তবে শর্তানুযায়ী হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান যা আদায় করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত জলপথের ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। ইরান এখন থেকে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ‘টোল’ বা মাশুল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনে এমন পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তেহরানের এই অনড় অবস্থান এশীয় ও ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের এই আগ্রাসী অর্থনৈতিক কৌশল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আধুনিক ‘জিও-ইকোনমিকস’ বা ভূ-অর্থনীতির এক বিবর্তিত রূপ। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন তাদের ‘ডলার-ভিত্তিক’ আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। অন্যদিকে, চীন তাদের হাতে থাকা ‘রেয়ার আর্থ’ বা বিরল খনিজ সম্পদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ান সংক্রান্ত মন্তব্যের জেরে চীন জাপানের খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার যে নজির স্থাপন করেছে, ইরান ঠিক সেই পথেই হাঁটছে।

টোকিওভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব জিওইকোনমিকস-এর গবেষক অ্যান্ড্রু ক্যাপিস্ট্রানো এই পরিস্থিতিকে ‘কৌশলগত অপরিহার্যতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকার জন্য প্রতিরোধ গড়ার সক্ষমতা থাকতে হয়। আপনাকে এটি বলার ক্ষমতা রাখতে হবে যে— তোমরা আমাদের প্রয়োজনীয় কিছু বন্ধ করলে, আমরাও তোমাদের জীবনরেখা স্তব্ধ করে দেব।”

বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ পল শেয়ার্ডের মতে, আমরা এখন এক বিপজ্জনক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। বিশ্বায়নের স্বর্ণালী যুগে নীতিনির্ধারণের চালকের আসনে থাকতেন অর্থনীতিবিদরা, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাজার উন্মুক্ত করা। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গা দখল করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। ফলে মুক্ত বাণিজ্যের উদার নৈতিকতার বদলে জায়গা করে নিয়েছে ‘সংরক্ষণবাদ’ ও ‘সন্দেহের রাজনীতি’।

ইরানের এই ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ বিশ্বকে একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি করেছে: আধুনিক বিশ্বে কেবল ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার থাকলেই চলে না, অন্য দেশকে নিজের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল করে তোলার সক্ষমতাই হলো আসল শক্তি। অন্যথায়, যে কোনো দেশ যে কোনো সময় বড় শক্তির শিকারে পরিণত হতে পারে।

এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালির ঢেউ কেবল পারস্য উপসাগরেই আছড়ে পড়ছে না, তা আঘাত করছে বৈশ্বিক শেয়ার বাজার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত। তেহরানের এই ‘টোল’ আদায়ের ঘোষণা যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়, তবে তা হবে মুক্ত সমুদ্রের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়, যা বিশ্বজুড়ে সংঘাতের ঝুঁকিকে আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে।

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.