মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় ক্রমবর্ধমান উত্তজনা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে অরক্ষিত হয়ে পড়া একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি। ফাইল ছবি: টাইমস অব ইসরায়েল
মধ্যপ্রাচ্যে দশকের পর দশক ধরে বজায় থাকা মার্কিন সামরিক আধিপত্যের ভৌত কাঠামোটি এক মাসের ব্যবধানে কার্যত ধসে পড়েছে। ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক বিধ্বংসী সংঘাতের জেরে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত অন্তত এক ডজন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এখন ‘অকেজো’ এবং ‘নিরাপত্তার জন্য বড় আপদ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তার যে ঐতিহাসিক সমীকরণ এই অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করত, তা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটে।
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে আরব সেন্টারের বার্ষিক সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরা এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, জর্ডান থেকে বাহরাইন—পুরো অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলো এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ‘প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স’-এর পরিচালক মার্ক লিঞ্চ সম্মেলনে এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমেরিকান আধিপত্যের যে কাঠামো আমরা চিনতাম, ইরান মাত্র এক মাসে তা তছনছ করে দিয়েছে। এমনকি বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরটিও এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে পুনরায় নৌবহর মোতায়েনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।”
এর আগে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এই ঘাঁটিগুলোকে ‘বসবাসের অনুপযোগী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ গোপন রাখলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্থাপনাগুলো এখন কোনো সামরিক উদ্দেশ্য সাধনের চেয়ে বরং ওই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৯টি সামরিক স্থাপনায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন থাকলেও সাম্প্রতিক যুদ্ধে তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পারসি একে ‘আমেরিকান নিরাপত্তা ছত্রছায়ার চুরমার হওয়া’ বলে অভিহিত করেছেন।
চলতি সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মিত্র দেশগুলোর মার্কিন স্থাপনা রক্ষায় ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার না থাকায় আরব দেশগুলো নিজেদের ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ শিকার বলে মনে করছে। ইরানকে রুখতে গিয়ে এসব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত শেষ হয়ে এসেছে, যা তাদের জ্বালানি কেন্দ্র ও সাধারণ জীবনযাত্রাকে অরক্ষিত করে তুলেছে।
শানা আর মার্শাল মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই ‘ঘনিষ্ঠতা’ এখন আর সুবিধা নয়, বরং আপদ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর একচেটিয়া নির্ভরতা থেকে সরে এসে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা অথবা কোনো মার্কিন মধ্যস্থতা ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরির পথে হাঁটতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত বালুচরে যে আমেরিকান আধিপত্যের সূচনা হয়েছিল ১৯৯০-এর উপসাগরীয় যুদ্ধের মাধ্যমে, ২০২৬ সালে এসে তার অবসান এক অনিবার্য বাস্তবতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মার্কিন ঘাঁটিগুলো যখন রক্ষকের বদলে ধ্বংসের অনুঘটক হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য নতুন জোট ও কৌশলের সন্ধান করা ছাড়া বিকল্প থাকে না। ওয়াশিংটন যদি দ্রুত তাদের প্রতিরক্ষা দর্শনে আমূল পরিবর্তন না আনে, তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের প্রস্থান কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
