ইরানের মানচিত্র।
বিশ্ব মানচিত্রের রাজনৈতিক সমীকরণ বারবার বদলেছে, সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে ধূলিসাৎ হয়েছে মিশরীয় কিংবা মেসোপটেমীয়র মতো প্রতাপশালী প্রাচীন সব সভ্যতা। কিন্তু গত সাত সহস্রাব্দ ধরে যে ভূখণ্ডটি তার আপন সংস্কৃতি, স্বকীয়তা ও আভিজাত্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম ইরান। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট থেকে চেঙ্গিস খাঁ—যুগে যুগে বিশ্বজয়ী যোদ্ধাদের পদানত হলেও পারস্যের আত্মাকে কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। আধুনিক ভূ-রাজনীতির তীব্র চাপ আর বৈশ্বিক হুমকির মুখেও ইরানের এই টিকে থাকার সক্ষমতা আজ বিশ্ব ঐতিহাসিকের কাছে এক বিস্ময়কর গবেষণার বিষয়।
ইতিহাসের পাতায় সম্রাট তৃতীয় দারাইশকে পরাজিত করে আলেকজান্ডারের পারস্য বিজয় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। রাজধানী পারসিপোলিসের রাজকীয় প্রাসাদে অগ্নিসংযোগ করেও আলেকজান্ডার এই সভ্যতার শিকড় উপড়ে ফেলতে পারেননি। বরং অদ্ভুত এক বৈপরীত্যে গ্রিক বীর নিজেই পারস্যের শিল্প ও সংস্কৃতির মোহে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন। ইতিহাসে যা ‘সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ’ হিসেবে পরিচিত, সেখানে আলেকজান্ডার নিজ বাহিনী ও পারস্যের মধ্যে যে গণবিবাহ প্রথা চালু করেছিলেন, তা ছিল বিজিতের সংস্কৃতির কাছে বিজয়ীর এক নীরব আত্মসমর্পণ। আজও পারস্যের জনপদে তিনি ধ্বংসকারী নয়, বরং ‘সিকান্দার’ হিসেবে কিংবদন্তি হয়ে আছেন।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চেঙ্গিস খাঁ এবং পরবর্তীতে তার উত্তরসূরি হালাগু খাঁর দুর্ধর্ষ মঙ্গল বাহিনী যখন পারস্য আক্রমণ করে, তখন মনে হয়েছিল এই প্রাচীন জনপদ চিরতরে মুছে যাবে। রাজনৈতিকভাবে তারা ইরান দখল করতে সক্ষম হলেও এখানকার গভীর জাতীয়তাবাদ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সামনে তাদের তলোয়ার ভোঁতা হয়ে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, মঙ্গলরা ইরানকে ভৌগোলিকভাবে দখল করলেও ইরানিদের হৃদয়ে প্রোথিত স্থাপত্যশৈলী, সাহিত্য ও পন্ডিতদের প্রভাব থেকে বের হতে পারেনি। উল্টো দুর্ধর্ষ সেই যোদ্ধারাই একসময় পারস্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক হতে বাধ্য হয়েছিল।
ইরানের অদম্য শক্তির পেছনে কেবল ইতিহাস নয়, প্রকৃতির দানও অনস্বীকার্য। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান একে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করেছে। তিন দিকে গগনচুম্বী পাহাড় আর অন্য প্রান্ত সমুদ্র ও রুক্ষ মরুভূমি দিয়ে ঘেরা এই জনপদ যে কোনো বহিঃশত্রুর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আধুনিক সামরিক কৌশলের যুগেও এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা এবং জনগণের দীর্ঘ ঐতিহ্য সচেতনতা ইরানকে অনন্য এক নিরাপত্তা প্রদান করেছে।
শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, রাজবংশ এসেছে এবং গেছে, কিন্তু পারস্যের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড আজও অক্ষত। সাত হাজার বছরের এই নিরবচ্ছিন্ন পথচলা প্রমাণ করে যে, কোনো জাতি যখন তার ঐতিহ্যের শিকড় গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে, তখন কোনো পরাশক্তিই তাকে চিরতরে নিঃশেষ করতে পারে না। ইরান কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, ইরান একটি নিরন্তর বয়ে চলা জীবন্ত ইতিহাস, যা আজও বিশ্বসভ্যতায় নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে।
বিষয় : ইরান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
