ছবি: সংগৃহীত
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংসদ অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি রেখে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি মাঠে নামার প্রস্তাব উঠেছে জাতীয় সংসদে। বুধবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনোয়ার হোসেন এই বৈপ্লবিক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতি বর্তমানে ‘মহামারী’ রূপ ধারণ করছে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার হাসপাতালগুলোতে সরাসরি তদারকি করা এখন সময়ের দাবি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে মনোয়ার হোসেন নিজের নির্বাচনী এলাকার স্বাস্থ্যসেবার এক জীর্ণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, মাগুরায় ২০০ শয্যার একটি বিশাল হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলেও পূর্ণাঙ্গ জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে তা কার্যত অচল। এমনকি হাসপাতালের দুটি লিফট অকার্যকর এবং আইসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো জরুরি বিভাগগুলো এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এমন অবকাঠামোগত সংকটের মধ্যেই হামের বিস্তার জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তিনি স্পিকারের মাধ্যমে প্রস্তাব করেন, “আগামীকাল বৃহস্পতিবার সংসদ ছুটি দিয়ে আমাদের সকল সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় পাঠানো হোক, যাতে তাঁরা সরাসরি হাসপাতাল পরিদর্শন ও মানুষের ভোগান্তি লাঘবে তদারকি করতে পারেন।”
একই অধিবেশনে চাঁদপুর-৫ আসনের সদস্য মো. মমিনুল হক বিগত ১৬ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহত সকল পরিবারের জন্য সমমর্যাদার দাবি তোলেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শহীদ পরিবারগুলো আর্থিক সহায়তা পেলেও এর আগের দীর্ঘ লড়াইয়ে যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারগুলো এখনো অবহেলিত। তিনি প্রতিটি পরিবারকে ২৫ লাখ টাকা করে সহায়তা প্রদানের জোর দাবি জানান। এছাড়া চাঁদপুরের নদীর নাব্য সংকট নিরসনে ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
খুলনা-১ আসনের সদস্য আমীর এজাজ খান তাঁর বক্তব্যে দাকোপ ও বটিয়াঘাটা অঞ্চলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের দাবি জানান। সেই সঙ্গে এই অঞ্চলে বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিটি উপজেলায় ‘মডেল মন্দির’ নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অন্যদিকে, নরসিংদী-১ আসনের সদস্য খায়রুল কবির খোকন রাষ্ট্রপতির ভাষণে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বাদ পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বর্তমান সরকারের স্বল্প সময়ের অর্জনকে ‘যুগান্তকারী’ বলে অভিহিত করেন।
শিক্ষা খাতের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কুমিল্লা-২ আসনের সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়া। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা বহাল তবিয়তে আছে, যা সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি পাঠ্যপুস্তকে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস পুনরুদ্ধারের প্রশংসা করার পাশাপাশি স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাবি জানান।
অষ্টম দিনের এই সংসদীয় বিতর্ক কেবল রাষ্ট্রপতির ভাষণের আনুষ্ঠানিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনার এক দর্পণ। হামের মতো একটি জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সংসদ সদস্যদের সরাসরি মাঠে পাঠানোর প্রস্তাবটি প্রমাণ করে যে, জনপ্রতিনিধিরা এখন কেবল নীতিনির্ধারণী কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না, বরং সরাসরি জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে আস্থার সংকট কাটাতে মরিয়া। এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
বিষয় : রাষ্ট্রপতির ভাষণ জাতীয় সংসদ হাম
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
