এ ইলাস্ট্রেশনে হরমুজ প্রণালির প্রণালির ম্যাপ ও থ্রি–ডি প্রিন্ট করা তেলের ব্যারেল দেখা যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ছায়াযুদ্ধ এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার অবসান ঘটাতে তেহরান যে দাবিদামা পেশ করেছে, তাতে বিশ্বনেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে একটি বিশেষ শর্ত—হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি’। কেবল তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বরং বিশ্বের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ইরান। প্রশ্ন উঠেছে, এই দাবির নেপথ্যে কি শুধুই রাজস্ব আয়, নাকি বিশ্ব অর্থনীতিকে হাতের মুঠোয় রাখার গভীর কোনো সমীকরণ?
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই সরু জলপথ দিয়ে। ইরান এখন এই ভৌগোলিক সুবিধাকেই সবচেয়ে বড় দরকষাকষির মাধ্যম বা 'লিভারেজ' হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরানের সাম্প্রতিক হামলায় এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় থমকে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফানদিয়ারি মনে করেন, "ইরান বুঝতে পেরেছে খুব কম খরচে এবং সহজ উপায়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে রাখা সম্ভব। এই যুদ্ধ থেকে তেহরান তাদের নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে।"
ইরানি নীতিনির্ধারকরা এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর 'টোল' বা ফি ধার্য করার একটি বিল অনুমোদনের কথা ভাবছেন। সিএনএন-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। প্রতি ট্যাংকারের জন্য যদি ২০ লাখ ডলার ফি ধরা হয়, তবে মাসে কেবল তেল থেকেই ইরানের আয় হতে পারে প্রায় ৬০ কোটি ডলার। এলএনজি যোগ করলে এই অঙ্ক ৮০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে—যা মিসরের সুয়েজ খালের আয়ের প্রায় সমান।
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরানের জন্য এটি হতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বস্তি। তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাস্কার মতে, "আন্তর্জাতিক নৌপথে টোল ধার্য করা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।" ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডেনমার্ক এমন চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক চাপে তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পদক্ষেপকে 'অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক' বলে সতর্ক করেছেন। জি-৭ দেশগুলোর বৈঠকে তিনি বলেন, হরমুজে ইরানের টোল-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বর্তমান বিশ্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, জলপথ বন্ধ করার সক্ষমতাকে ইরান একটি কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে যাবে।
লয়েডস লিস্ট-এর তথ্যমতে, নজিরবিহীনভাবে ইতিমধ্যেই ২০টিরও বেশি জাহাজ ইরান উপকূলের একটি নতুন করিডর ব্যবহার করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত দুটি জাহাজ নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানকে প্রায় ২০ লাখ ডলার ফি পরিশোধ করেছে। লয়েডস লিস্টের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মিডের মতে, "আলোচনায় অগ্রগতি না হলে এই গোপন অর্থ লেনদেন আরও বাড়বে।"
ইরান এখন আর শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা পারমাণবিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তারা চায় বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ধমণীর নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিয়ম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তেহরান মূলত এক নতুন ‘মেরিটাইম অর্ডার’ বা সামুদ্রিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি সফল হলে বিশ্ব বাণিজ্যের স্বাধীনতা যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তেমনি ইরান হয়ে উঠবে মধ্যপ্রাচ্যের অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক শক্তি। কূটনীতির টেবিলে এখন প্রশ্ন একটাই—বিশ্ব কি ইরানের এই ‘টোল গেট’ মেনে নেবে, নাকি সমুদ্রের এই দখলদারিত্ব ঠেকাতে শুরু হবে আরও ভয়াবহ কোনো সংঘাত?
তথ্যসূত্র: সিএনএন
বিষয় : হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল যুদ্ধ ইরান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
