ইসরায়েলে ইরানি হামলার ফাইল ছবি: এপি
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে যখন যুদ্ধের বারুদ আর কূটনীতির ধোঁয়া সমান্তরালভাবে উড়ছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করল তেহরান। ইরানের মাটিতে মার্কিন স্থলসেনাদের পা রাখার যেকোনো প্রচেষ্টাকে ‘আগুনের লেলিহান শিখায়’ ভস্মীভূত করার হুমকি দিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। একদিকে পাকিস্তানে চার দেশের রুদ্ধদ্বার বৈঠক, অন্যদিকে ইরানের এই রণহুঙ্কার—সব মিলিয়ে অঞ্চলটির স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি ও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, স্পিকার গালিবাফ মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমাদের বাহিনী মার্কিন সেনাদের আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যাতে তাদের ওপর আগুনের বৃষ্টি ঢেলে দেওয়া যায় এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের চিরতরে শিক্ষা দেওয়া যায়।”
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ২ হাজার ৫০০ মার্কিন মেরিন সেনার মোতায়েন তেহরানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। গালিবাফ চলমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ‘লোকদেখানো’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আলোচনার চেয়ে শক্তির মহড়াই এখন সময়ের দাবি।
সংঘাতের এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ‘রেভল্যুশনারি গার্ড’। ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শাখা ক্যাম্পাসকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। জর্জটাউন, নিউ ইয়র্ক ও নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলো এখন সরাসরি হুমকির মুখে। সোমবার দুপুরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার নিন্দা না জানায়, তবে এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আলটিমেটাম দিয়েছে বাহিনীটি।
যখন রণধ্বনি বাজছে, তখন শান্তির খোঁজে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তবে এই সংলাপে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিনিধি নেই। মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেল আতি জানান, তাদের লক্ষ্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ‘সরাসরি সংলাপ’ শুরু করা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব ইরান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। পরিবর্তে তেহরান নিজস্ব ৫ দফা দাবি পেশ করেছে, যার মধ্যে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
গত এক মাসের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কেবল ইরানেই প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৯০০ জন। যুদ্ধের আঁচ লেগেছে লেবানন ও ইসরায়েলেও। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। ইরাক সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসা ৭১ বছর বয়সী ইরানি নাগরিক রাজ্জাক সাগির আল-মুসাউই আর্তনাদ করে বলেন, “আমরা জানি না কখন আমাদের ওপর হামলা হবে। আমি সত্যিই খুব ভীত।”
যুদ্ধের প্রভাবে শুধু প্রাণহানিই নয়, বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতায় এখন চরম ঝুঁকির মুখে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশের মতে, যেকোনো চুক্তির জন্য ইরানের কাছ থেকে ভবিষ্যতে হামলা না করার ‘সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি’ প্রয়োজন। কিন্তু তেহরানের বর্তমান অবস্থান এবং মার্কিন সেনা মোতায়েনের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি বলছে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিয়ন্ত্রিত অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে। কূটনীতি যদি দ্রুত এই আগুনের শিখা নেভাতে না পারে, তবে এই সংঘাত কেবল মানচিত্র নয়, বিশ্ব ব্যবস্থার ভারসাম্যও তছনছ করে দিতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
