ইউক্রেন যুদ্ধে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া। ফাইল ছবি
ইউক্রেনের রণক্ষেত্র থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশ—ভ্লাদিমির পুতিন ও আয়াতুল্লাহ আল খামেনির কৌশলগত সখ্য এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যখন ইরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, তখন ক্রেমলিনের ‘অদৃশ্য হাত’ তেহরানকে কতটা সুরক্ষা দিচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সহায়তাকে ‘সামান্য’ বলে উড়িয়ে দিলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান থেকে শুরু করে ড্রোনের আধুনিকায়ন—রাশিয়া ও ইরানের এই সমীকরণ এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাশ্চাত্যের সামরিক স্যাটেলাইটের শ্রেষ্ঠত্বের যুগে রাশিয়া ইরানকে তার নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা ‘লিয়ানা’র সুবিধা দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো পাভেল লুজিনের মতে, মার্কিন রণতরি ও নৌবাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করতেই এই সিস্টেমটি তৈরি করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২২ সালে রাশিয়ার সহায়তায় উৎক্ষেপণ করা ইরানি স্যাটেলাইট ‘খৈয়াম’ এখন ভূপৃষ্ঠের এক মিটারেরও কম আয়তনের বস্তু চিহ্নিত করতে সক্ষম। তেহরান সম্প্রতি মার্কিন রণতরি ‘আব্রাহাম লিংকন’-এ আঘাত হানার যে দাবি করেছে, তার পেছনে রাশিয়ার সরবরাহ করা নিখুঁত স্থানাঙ্ক বা কোঅর্ডিনেটস থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সামরিক বিশ্লেষকরা।
ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন এখন আর কেবল সস্তা কোনো মরণাস্ত্র নেই। মস্কো এই ড্রোনগুলোকে ক্যামেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রাশিয়ার তৈরি বিশেষ অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন মডিউল ‘কোমেট-বি’ দিয়ে সজ্জিত করেছে। সম্প্রতি সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে আঘাত হানা হিজবুল্লাহর ড্রোনেও এই রুশ প্রযুক্তির উপস্থিতি মিলেছে। ইউক্রেনের সাবেক জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কোর মতে, রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে ‘ডামি’ বা নকল ড্রোন পাঠিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার যে কৌশল রপ্ত করেছে, তা এখন ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সহায়তা করছে।
পুতিনের দ্বিমুখী লাভ ও তেলের রাজনীতি
মস্কো কি আসলেই ইরানকে জেতাতে চায়? বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরটি হলো—না। ক্রেমলিনের মূল লক্ষ্য ইরানকে শক্তিশালী করা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা জিইয়ে রেখে নিজের ফায়দা লোটা। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তেলের এই উচ্চমূল্য পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার আর্থিক সক্ষমতা দিচ্ছে।
নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের ফেলো রুসলান সুলেইমানভ মনে করেন, রাশিয়ার বর্তমান সহায়তা মূলত একটি ‘শুভেচ্ছার নিদর্শন’ বা সাহায্যের বিভ্রম মাত্র। এর উদ্দেশ্য তেহরানকে কেবল এটি দেখানো যে, সংকটে রাশিয়া তার পাশে আছে, যদিও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর কোনো পরিকল্পনা মস্কোর নেই।
দিনশেষে, রাশিয়া ও ইরানের এই সম্পর্ক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং এটি একটি ‘সুবিধাবাদী মৈত্রী’। ইরান যেমন বোঝে যে রুশ সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে হারানো অসম্ভব, তেমনি রাশিয়াও জানে ইরানের অস্থিরতা তাদের তেলের বাজারকে চাঙা রাখবে। ট্রাম্পের ভাষায় এটি ‘সামান্য’ সহায়তা হতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির দাবার বোর্ডে এই সামান্য চালই অনেক বড় সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
