ইরাকে মার্কিন দূতাবাসের ওপর ড্রোন হামলার পরবর্তী ধ্বংসস্তূপ। ছবি: এএফপি
ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে রাশিয়ার উদ্ভাবিত বিধ্বংসী ড্রোন কৌশল এখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমিতে ডানা মেলছে। ইরান ও তার সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পশ্চিমা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুদ্ধের ব্যাকরণ বদলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও ফুটেজ ও সামরিক বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাগদাদ থেকে হরমুজ প্রণালি—সর্বত্রই মার্কিন আধিপত্যের সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়ার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ইরানি ড্রোন প্রযুক্তি। বিশেষ করে ফাইবার অপটিক নিয়ন্ত্রিত ‘আনজ্যামেবল’ ড্রোন এখন পেন্টাগনের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত সপ্তাহে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণে ড্রোন ও রকেট হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ছিল কেবল একটি ট্রেলার। ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ফাইবার অপটিক তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলো কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক জ্যামিং ছাড়াই মার্কিন ঘাঁটির রাডার ব্যবস্থা ও ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে নিখুঁত আঘাত হানছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ বিবর্তন নয়, বরং যুদ্ধের ধরনে এক আমূল পরিবর্তন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া যেভাবে তার-নিয়ন্ত্রিত ড্রোনের মাধ্যমে কিয়েভের প্রতিরক্ষা ভেঙেছে, সেই একই পাঠ এখন তেহরান প্রয়োগ করছে মধ্যপ্রাচ্যে। এই ড্রোনগুলো ইলেকট্রনিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ধরা পড়ে না, যা মার্কিন নৌযান ও স্থলসেনাদের জন্য এক ‘কিল জোন’ বা মৃত্যুপুরী তৈরি করতে সক্ষম।
রাশিয়ার পাঠশালায় ইরান
২০২৪ সালের শেষভাগে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ওয়ার গাইডেড’ ড্রোনের সাফল্য তেহরানের চোখ খুলে দিয়েছে। মস্কো ও তেহরানের এই সামরিক মৈত্রী এখন কেবল ড্রোন সরবরাহে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অভিজ্ঞতার এক গভীর আদান-প্রদানে রূপ নিয়েছে।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিয়ুক বলেছেন, "মস্কো ও তেহরান এখন প্রকৃত মিত্রের মতো একে অপরের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময় করছে। ইরান অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের শিক্ষাগুলো গ্রহণ করছে।" পেন্টাগন এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে।
আকাশের পাশাপাশি সমুদ্রপথের লড়াইও বদলে গেছে। ইউক্রেন যেভাবে প্রথাগত নৌবাহিনী ছাড়াই ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার ব্ল্যাক সি ফ্লিটকে বিপর্যস্ত করেছে, ইরান সেই একই মডেল হরমুজ প্রণালিতে ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও ইরানের সামুদ্রিক ড্রোনগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অতটা উন্নত নয়, কিন্তু বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহের এই সরু জলপথে ছোট ছোট ড্রোন ঝাঁক মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ড্রোনের বিষয়ে তারা বিশ্বসেরা এবং ইউক্রেনীয় অভিজ্ঞতার তাদের প্রয়োজন নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন কথা বলছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট’-এর মাইকেল কফম্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এফপিভি প্রযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ইউক্রেন যে স্তরের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতায় পৌঁছেছে, সেখানে যেতে পেন্টাগনের এখনো দীর্ঘ পথ বাকি।
ন্যাটোর সাবেক নীতি-পরিকল্পনা পরিচালক ফাব্রিস পতিয়েরের মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এখনো এক ধরনের ‘ঔদ্ধত্যের দেয়াল’ রয়েছে। তারা মনে করে তাদের আকাশপথের আধিপত্য সব জয় করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ড্রোন বিপ্লব এই চিরাচরিত শ্রেষ্ঠত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখা এখন কেবল বিশাল যুদ্ধজাহাজ বা শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করছে না। ড্রোনের ক্ষুদ্র অথচ নিখুঁত আঘাত যুদ্ধের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে। ইরান যদি রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারে, তবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাসদস্যরা এমন এক অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি হবেন, যা আগের যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে ভয়াবহ হবে।
তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
