তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। ফাইল ছবি: রয়টার্স
পারস্য উপসাগরের উত্তাল তরঙ্গে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, তখন পর্দার আড়ালে এক নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের আভাস মিলছে। একদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চরম হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে তেহরানের রণকৌশলী অবস্থান—এই দুইয়ের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে আকস্মিক উত্থান ঘটেছে পাকিস্তানের। কূটনৈতিক পাড়ায় এখন জোরালো গুঞ্জন, চিরবৈরী দুই শক্তিকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ইসলামাবাদ।
গত রবিবার ভোররাতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার চরম সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শর্ত না মানলে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়ার হুমকি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি করে। তবে সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নাটকীয়ভাবে সুর বদলান ট্রাম্প। ইরান-মার্কিন আলোচনাকে ‘ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ আখ্যা দিয়ে সব ধরনের সামরিক হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেন তিনি।
যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই আলোচনার খবর অস্বীকার করেছে। ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ একে বাজার নিয়ন্ত্রণের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’ ও ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে অন্দরমহলের খবর ভিন্ন। বিবিসির পার্টনার সিবিএস নিউজকে এক ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ১৫ দফা প্রস্তাব সম্বলিত একটি তালিকা বর্তমানে তেহরানের টেবিলে পর্যালোচনার অধীন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংকট নিরসনে পাকিস্তান কেবল মধ্যস্থতাই করছে না, বরং ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই আলোচনায় হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।
ইসলামাবাদের এই ভূমিকা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও বিশ্লেষকরা একে ‘কৌশলগত গভীরতা’ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের ঘনিষ্ঠতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাকিস্তানের মনোনয়ন—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের একটি অংশের সহানুভূতি এখন ইসলামাবাদের দিকে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, “পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের কূটনৈতিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই তাদের এই ভূমিকা অস্বাভাবিক নয়।” অন্যদিকে, ইরানের ওপর পাকিস্তানের প্রভাবও অনস্বীকার্য। সাবেক কূটনীতিক শামশাদ আহমেদের বিশ্বাস, ইরানিরা যেকোনো আরব দেশের তুলনায় পাকিস্তানের ওপর বেশি আস্থা রাখবে। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকেও পাকিস্তানকে ‘বিশেষ প্রিয়’ দেশ হিসেবে অভিহিত করার নজির রয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রয়োজনে ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র ওপর জোর দিচ্ছে। সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ফোনালাপ সেই ইঙ্গিতই দেয়, যেখানে ‘উত্তেজনা হ্রাস’ ছিল আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য।
তবে এই শান্তিপ্রক্রিয়া কতটুকু টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই যাচ্ছে। ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক অস্থিরতা—এই দুই চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিয়ে পাকিস্তান কি পারবে মধ্যস্থতায় সফল হতে? বিশ্ব এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
বিষয় : ইরান পাকিস্তান মধ্য প্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্র
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
