আলী লারিজানি। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আলী লারিজানি ছিলেন এক শান্ত, প্রজ্ঞাবান ও বাস্তববাদী মুখ। একদিকে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের জটিল তত্ত্বের ব্যাখ্যাকারী, অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক টেবিলের তুখোড় তার্কিক—এই দুই সত্তার মিশেলে লারিজানি হয়ে উঠেছিলেন তেহরানের অপরিহার্য এক স্তম্ভ। তবে সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, ইরানের এই নিরাপত্তা প্রধান এক বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। তেহরান এখনো এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না করলেও, লারিজানির বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় রাজনৈতিক জীবন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে এক ধনাঢ্য ও বিদগ্ধ পরিবারে জন্ম নেওয়া লারিজানিকে ২০০৯ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। তাঁর বাবা মির্জা হাসেম আমোলি ছিলেন কিংবদন্তি ধর্মীয় পণ্ডিত। লারিজানির পারিবারিক প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, তাঁর ভাইয়েরাও ইরানের বিচার বিভাগ ও নীতিনির্ধারণী পর্ষদে শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন। গণিত ও কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতক হলেও লারিজানি ডক্টরেট করেছেন পশ্চিমা দর্শনে; তাঁর থিসিসের বিষয়বস্তু ছিল দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। এই একাডেমিক পটভূমিই তাঁকে অন্য সব ধর্মতাত্ত্বিক নেতাদের চেয়ে আলাদা ও আধুনিক করে তুলেছিল।
১৯৮০-এর দশকে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগদানের মাধ্যমে লারিজানির কর্মজীবন শুরু হলেও পরে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা (আইআরআইবি) এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হাল ধরেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ ছিল ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল, যখন তিনি টানা তিন মেয়াদে ইরানের পার্লামেন্টের (মজলিস) স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) অনুমোদনে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। যদিও কট্টরপন্থীদের চাপে ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করা হয়, কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁকে পুনরায় সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনেন।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হওয়ার পর লারিজানির ‘বাস্তববাদী’ খোলসটি ভেঙে পড়ে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেওয়া লারিজানি হঠাৎ করেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া তাঁর শেষ ভাষণে তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেন:
“যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী গোষ্ঠী ইরানি জাতির হৃদয়ে যে আগুন জ্বালিয়েছে, আমরা তাদের হৃদয় পুড়িয়ে তার প্রতিশোধ নেব। আমাদের সেনারা তাদের এমন শিক্ষা দেবে যা তারা কখনো ভুলবে না।”
লারিজানি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, নেতাদের হত্যা করে ইরানকে অস্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি এখন ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু।
খামেনি-পরবর্তী ইরানের সংকটকালীন তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী পর্ষদে লারিজানির ভূমিকা ছিল তুরুপের তাসের মতো। তিনি কেবল একজন নিরাপত্তাপ্রধান ছিলেন না, বরং যুদ্ধের ময়দানে তেহরানের পরবর্তী কৌশল কী হবে, তার প্রধান রূপকারও ছিলেন। ইসরায়েলের দাবি সত্য হলে, লারিজানির প্রস্থান ইরানের জন্য কেবল একজন নেতার হারানো নয়, বরং এক যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক ও কৌশলগত নেতৃত্বের অবসান।
পুরো অঞ্চল এখন এক মহাপ্রলয়ের দ্বারপ্রান্তে। লারিজানি যে ‘আগে কখনো দেখেনি এমন শক্তি’ দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে ইরান সেই পথে কতটা এগোবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বিষয় : যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল যুদ্ধ ইরান ইসরায়েল সংঘাত ইরান
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
