ফিলিস্তিনের আধুনিক ইতিহাসের রূপকার ও প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ওয়ালিদ খালিদি (১৯২৫–২০২৬), যার গবেষণা ফিলিস্তিনিদের আত্মপরিচয়ের অধিকারকে বিশ্বদরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ছবি: আল-জাজিরা
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ের (নাকবা) ইতিহাসকে যিনি বিশ্ব দরবারে এক অখণ্ড দলিলে রূপ দিয়েছিলেন, সেই প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসবিদ ও বুদ্ধিজীবী ওয়ালিদ খালিদি আর নেই। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসে ১০০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে আধুনিক আরব্য ইতিহাসচর্চা এবং ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।
ইতিহাসের অতন্দ্র প্রহরী
১৯২৫ সালে জেরুজালেমের এক অভিজাত পণ্ডিত পরিবারে জন্ম নেওয়া ওয়ালিদ খালিদি কেবল একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন শেকড়চ্যুত এক জাতির হারানো স্মৃতির অতন্দ্র প্রহরী। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতবিদ্য শিক্ষার্থী তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (এইউবি) এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা ও গবেষণা করেছেন। ১৯৬৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনস্টিটিউট ফর প্যালেস্টাইন স্টাডিজ’ (আইপিএস), যা বর্তমানে ফিলিস্তিন বিষয়ক গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।
‘নাকবা’ ও হারিয়ে যাওয়া জনপদের আখ্যান
ওয়ালিদ খালিদির সবচেয়ে প্রভাবশালী কাজ হিসেবে বিবেচিত হয় তাঁর অমর সৃষ্টি ‘অল দ্যাট রিমেইনস’। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া ৪০০-র বেশি ফিলিস্তিনি গ্রামের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন। জায়োনিস্ট মিলিশিয়াদের হাতে জনশূন্য হওয়া এসব জনপদকে তিনি কেবল মানচিত্রের বিন্দু হিসেবে নয়, বরং জীবন্ত এক সংস্কৃতির চাক্ষুষ দলিল হিসেবে নথিবদ্ধ করেছেন। তাঁর আরেকটি আকর গ্রন্থ ‘বিফোর দেয়ার ডায়াসপোরা’ ১৯৪৮-পূর্ব ফিলিস্তিনি সমাজের দৈনন্দিন জীবনের দুর্লভ আলোকচিত্রের এক অনন্য আর্কাইভ, যা ফিলিস্তিনিদের ভূমিপুত্র হওয়ার অধিকারকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও শান্তি মিশন
একাডেমিক জগতের বাইরেও ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ে কূটনৈতিক ময়দানে সক্রিয় ছিলেন খালিদি। ১৯৬৭ সালের ‘নাকসা’ বা আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তিনি জাতিসংঘে ইরাকি প্রতিনিধি দলের উপদেষ্টা এবং পরবর্তীতে আরব লিগের মহাসচিবের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনেও তিনি জর্ডান-ফিলিস্তিন যৌথ প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র সমাধান।
শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
খালিদির প্রয়াণে বিশ্বজুড়ে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত হুসাম জমলোট তাঁকে ‘জাতীয় সম্পদ ও প্রজন্মের মেন্টর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটন ডিসির আরব সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক খলিল জাহশান মন্তব্য করেছেন, “খালিদি নামটি তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ফিলিস্তিনের সমার্থক হয়ে উঠেছিল।”
ওয়ালিদ খালিদি এমন এক সময়ে বিদায় নিলেন, যখন ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব আবারও চরম সংকটের মুখে। তবে গবেষকদের মতে, তাঁর রেখে যাওয়া পাণ্ডিত্য ও প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী প্রজন্মের ফিলিস্তিনিদের জন্য ইতিহাসের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
