তেহরানে সাম্প্রতিক বিমান হামলার পর একটি আবাসিক এলাকার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন শুধু যুদ্ধবিমানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের আলোর ঝলকানি। কিন্তু এই আগুনের উত্তাপ কেবল ইরান বা ইসরায়েলের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে। তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, তার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে বিশ্বের নিভৃত প্রান্তের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম, বন্ধকী চুক্তির বিলুপ্তি এবং নিত্যপণ্যের অসহনীয় ঊর্ধ্বগতিতে এক মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে মানবতা।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘোষণা অনুযায়ী এই পথ অবরুদ্ধ থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের সংরক্ষিত ভাণ্ডার থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েও বাজার স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এশিয়ার অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাকিস্তানের স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—যা একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, ১৭ হাজারের বেশি আবাসিক ভবন এবং অসংখ্য স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরান ও লেবাননে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, এমন এক সময়ে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো তাদের বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার বাজেট উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ত্রাণ সংস্থাগুলো এখন তহবিলের অভাব আর যুদ্ধের প্রতিবন্ধকতা—এই দ্বিমুখী সংকটে জর্জরিত।
"বর্তমান পরিস্থিতি ক্ষুধার্তদের জরুরি সংকটের দিকে এবং যারা আগে থেকেই সংকটে ছিলেন, তাদের দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।"
— স্যাম ভিগারস্কি, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।
দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা কেন্দ্রগুলোও এখন নিরাপদ নয়। আকাশপথে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ের কনটেইনার টার্মিনালে আছড়ে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে ত্রাণ কার্যক্রম। নৌপথে ঝুঁকি বাড়ায় কোম্পানিগুলো কনটেইনার প্রতি ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত ‘ইমার্জেন্সি সারচার্জ’ আরোপ করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লুএফপি) জানিয়েছে, ভারত থেকে সুদান পর্যন্ত পণ্য পৌঁছাতে এখন অতিরিক্ত ৯ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ কেবল খাদ্যের দামই বাড়াচ্ছে না, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের ক্লিনিকগুলোতে জেনারেটর চালানোর ব্যয়ও নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকরা এখন ত্রিমুখী সংকটে। একদিকে কাজ হারানো বা আয় কমে যাওয়ার শঙ্কা, অন্যদিকে জীবন বাঁচিয়ে দেশে ফেরার সামর্থ্যহীনতা। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। পাশাপাশি, সুদানের মতো দেশগুলোর কৃষি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সারের অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আগামীর খাদ্য নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে।
মার্কিন ভোটাররা এমন এক যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করছেন যার কোনো নৈতিক বা যৌক্তিক ভিত্তি তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ তৈরির ক্ষমতা তাদের হাতে থাকলেও, মাঠপর্যায়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো এখন সময়ের কঠিন চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে মানবিক করিডোর তৈরির দাবি জানালেও, স্থায়ী সমাধান কেবল যুদ্ধের অবসান। যতক্ষণ এই বারুদের খেলা বন্ধ না হবে, ততক্ষণ বিশ্বের নিভৃত কোণের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কেবল দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
