মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হরমুজ প্রণালীতে স্থবিরতা এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দামের মুখে রুশ তেলবাহী জাহাজের চলাচল এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় আলোচনার বিষয়। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাল রণক্ষেত্রে যখন তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে, তখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করার জন্য ওয়াশিংটনের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়েছে ক্রেমলিন। শুক্রবার মস্কো থেকে আসা এই বার্তা বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা রাশিয়া এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে তাদের অর্থনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পারাপার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা রুশ তেল বিক্রির অনুমতি দিয়েছে, যা কিয়েভ ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেস্কভ সাংবাদিকদের বলেন, "বিশ্ব শক্তি বাজার স্থিতিশীল করার প্রয়োজনে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এখন এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি পণ্যের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব।"
প্রো-ক্রেমলিন সংবাদপত্র 'ইজভেস্টিয়া'র মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে মাত্র ১১ ডলার বৃদ্ধি পেলে রাশিয়ার বার্ষিক আয় প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। ২০২২ সাল থেকে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির কারণে যে বাজেট ঘাটতিতে রাশিয়া ভুগছিল, এই মূল্যবৃদ্ধি তা কাটিয়ে উঠতে বড় সহায়ক হচ্ছে।
রাশিয়ার অর্থনৈতিক দূত কিরিল দিমিত্রিভ তাঁর টেলিগ্রাম বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র কার্যত স্বীকার করে নিচ্ছে যে রুশ তেল ছাড়া বিশ্ববাজার অচল। ইউরোপের কিছু আমলাতান্ত্রিক বাধা সত্ত্বেও এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থেই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।"
মস্কোর এই আহ্বানে ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয় হলেও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি-৭ জোট। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, "হরমুজ প্রণালীর সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কোনো সুযোগ নেই। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত।"
একই সুর শোনা গেছে জার্মান অর্থমন্ত্রী ক্যাথেরিনা রাইছের কণ্ঠেও। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে আমরা মূলত পুতিনের যুদ্ধ তহবিলের যোগান দিচ্ছি কি না, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।"
ওয়াশিংটনের সীমিত ছাড়
এরই মধ্যে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ একটি স্বল্পমেয়াদী লাইসেন্স ইস্যু করেছে, যার মাধ্যমে ১২ মার্চ পর্যন্ত জাহাজে লোড হওয়া রুশ তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট একে একটি ‘সংক্ষিপ্ত ও কৌশলগত পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ডামাডোলে তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকাতে জো বাইডেন প্রশাসন এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদিও সমুদ্রপথে রুশ তেল আমদানি বন্ধ রেখেছে, কিন্তু হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার পাইপলাইনগুলোতে ইউক্রেনীয় হামলার কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইউরোপেও জ্বালানি বিতর্ক নতুন মোড় নিচ্ছে। ভ্লাদিমির পুতিন গত সপ্তাহেই ইউরোপকে ‘দীর্ঘমেয়াদি ও রাজনৈতিক চাপমুক্ত’ শর্তে তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা ইইউ দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিভাজন তৈরি করতে পারে।
বিষয় : নিষেধাজ্ঞা ওয়াশিংটন রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র তেল
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
