ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতির সমীকরণ মেলাচ্ছেন অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াং। তার ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’ মডেলটি এখন বিশ্বজুড়ে কৌশলবিদদের ভাবিয়ে তুলছে। ছবি: সংগৃহীত
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কি আমাদের এক অনিবার্য পতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? ইউটিউব চ্যানেল ‘প্রেডিক্টিভ হিস্ট্রি’র সঞ্চালক এবং বেইজিংয়ের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জুয়েকিন জিয়াংয়ের সাম্প্রতিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই বিশ্লেষক দাবি করেছেন, আগামী ৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্ব এক ভয়াবহ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে, যার শেষ পরিণতি হতে পারে ‘অর্থহীন বিদেশি যুদ্ধ’।
১. গণতন্ত্রের অবক্ষয় ও কর্তৃত্ববাদের উত্থান
অধ্যাপক জিয়াংয়ের প্রথম পূর্বাভাসটি পশ্চিমা বিশ্বের মূল ভিত্তি নিয়ে। তিনি মনে করেন, আদিতে কোনো ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ও মেধাভিত্তিক থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদে রূপ নেয়। জিয়াংয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইতোমধ্যে স্বাধীনতার এই ক্ষয়িষ্ণু রূপ স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সামরিক শক্তির অতি-ব্যবহারকে তিনি এই কর্তৃত্ববাদেরই প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
২. অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আস্থার সংকট
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যখন সংকুচিত হয়, তখন সাধারণ মানুষ ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। জিয়াংয়ের দ্বিতীয় পূর্বাভাস অনুযায়ী, মানুষের কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস নামবে, যা সরকারগুলোকে গভীর সংকটে ফেলবে।
৩. জনমিতি পরিবর্তন ও অভিবাসন বিতর্ক
অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে এবং শ্রমবাজার সচল রাখতে সরকারগুলো তখন ব্যাপকভাবে অভিবাসীদের ওপর নির্ভর করতে পারে। জিয়াং একে ‘জনসংখ্যা বদলে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই কৃত্রিম জনমিতিক পরিবর্তন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করবে।
৪. অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের ছায়া
অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা যখন চরমে পৌঁছাবে, তখন মানুষ রাজপথে একে অপরের মুখোমুখি হবে। জিয়াংয়ের চতুর্থ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি পশ্চিমা দেশগুলোকে গৃহযুদ্ধের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাতে পারে। নাগরিক অসন্তোষ যখন সরাসরি সরকারের দিকে ধেয়ে আসবে, তখনই শুরু হবে শাসকগোষ্ঠীর ‘বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল’।
৫. গন্তব্য যখন ‘অর্থহীন যুদ্ধ’
জনগণের ক্ষোভের অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে সরকারগুলো শেষ অস্ত্র হিসেবে বেছে নেবে যুদ্ধকে। জিয়াংয়ের ভাষায়, “বিকল্প যখন যুদ্ধ অথবা বিপ্লব, তখন শাসকদের কাছে যুদ্ধই সহজ পথ।” তিনি মনে করেন, মানুষকে যুদ্ধের উন্মাদনায় ব্যস্ত রাখতে পারলে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা সহজ হয়, যা পৃথিবীকে এক অস্থির সংঘাতময় ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কেন জিয়াংকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ব?
অধ্যাপক জিয়াংয়ের বিশ্লেষণ পদ্ধতি মূলত আইজ্যাক আসিমভের কাল্পনিক ‘সাইকোহিস্ট্রি’ দ্বারা অনুপ্রাণিত, যেখানে গেম থিওরি ও ঐতিহাসিক উপাত্ত ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ অনুমান করা হয়। ২০২৪ সালে করা তার তিনটি ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে দুটি ইতিমধ্যেই সত্য প্রমাণিত হয়েছে: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সংঘাত। এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তার তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিতর্কিত পূর্বাভাসটি— “ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।”
যদিও জিয়াং বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে তার এই মডেলটি কেবল একটি ‘তত্ত্ব’, তবুও সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ঘটনাবলী তার প্রতিটি পূর্বাভাসকে যেন ধাপে ধাপে সত্য প্রমাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
