গত বছর ওয়াশিংটনে নরেন্দ্র মোদী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই আলোচিত মুহূর্ত। ছবি: পিটিআই
বিশ্বজুড়ে ঘনীভূত হওয়া জ্বালানি সংকটের মুখে ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে ৩০ দিনের এক ‘অস্থায়ী ছাড়’ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেই ওয়াশিংটন এই বিশেষ নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে। তবে এই সুযোগ কেবল সমুদ্রে আটকে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং পারস্য উপসাগরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা একাধারে ‘কূটনৈতিক ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ এবং ভারতের ওপর ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ হিসেবে দেখছেন।
গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় দুই দেশের সম্পর্কে যে উষ্ণতা দেখা গিয়েছিল, তাতে জল ঢেলে দিয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতি। রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জেরে ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর মৌখিক প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে মার্কিন প্রশাসন সেই শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কের সমীকরণ নতুন মোড় নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের এক-পঞ্চমাংশ এবং ভারতের তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই সম্পন্ন হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই প্রণালী বন্ধের হুমকি দেওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের শোধনাগারগুলোকে সচল রাখতে রাশিয়ার তেল কেনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একপ্রকার ‘অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট করেছেন যে, এই ছাড় অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য এবং এটি রাশিয়াকে কোনো বড় আর্থিক সুবিধা দেবে না। বরং তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভারত অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকা থেকে জ্বালানি আমদানির পরিমাণ বাড়াবে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন একদিকে ভারতকে পাশে রাখতে চাইছে, আবার অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দিল্লির দীর্ঘদিনের জ্বালানি সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য প্রচ্ছন্ন চাপ বজায় রাখছে।
ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কাছে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বর্তমানে দেশের কৌশলগত ভাণ্ডারে প্রায় ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেল এবং সমপরিমাণ পেট্রোল ও ডিজেল সংরক্ষিত আছে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স সংস্থা ‘কেপলার’-এর মতে, ভারতের স্টোরেজে থাকা ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল দিয়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। বিকল্প পথ ব্যবহার করে তেল আমদানির চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় সংস্থাগুলো।
ভারতের এই ‘সাময়িক ছাড়’ পাওয়া নিয়ে ভূ-কৌশল বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি একে ভারতের জ্বালানি সার্বভৌমত্বের ওপর মার্কিন আধিপত্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, দিল্লির নীরবতা এবং ওয়াশিংটনের এই দানশীলতা প্রমাণ করে যে ভারতের জ্বালানি নীতি এখন অনেকটাই মার্কিন চাপের মুখে আবর্তিত হচ্ছে। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ গীতাঞ্জলি সিন্হা রায় মনে করেন, এটি ভারতের জন্য একাধারে কূটনৈতিক জয় এবং দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন বলয়ে প্রবেশের সংকেত।
বিষয় : ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ভারত যুক্তরাষ্ট্র
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
