তেহরানে হিজবুল্লাহর একটি কার্যালয় পরিদর্শনে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনি। ছবিটি ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর তোলা। ছবি: রয়টার্স
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে সংকটময় এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশটির নীতি-নির্ধারকেরা। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণের পর তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন—কে হচ্ছেন পরবর্তী ‘সুপ্রিম লিডার’? ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ আর অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, খামেনির দ্বিতীয় পুত্র ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিই এখন পর্যন্ত এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তবে এই উত্তরাধিকার কেন্দ্র করে যেমন সংহতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি দানা বাঁধছে নতুন সংঘাতের শঙ্কা।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই তেহরানে শুরু হয়েছে রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক তৎপরতা। মঙ্গলবার ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের পর্ষদ ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টস’ পরবর্তী নেতা নির্বাচনে একাধিক রুদ্ধদ্বার ও ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে মিলিত হন। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তিনটি ভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মোজতবা খামেনির নামই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
দীর্ঘদিন ধরে বাবার শাসনের ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করা মোজতবা জনসাধারণের কাছে খুব একটা পরিচিত না হলেও, ইরানের শক্তিশালী ‘ইসলামি বিপ্লবী গার্ড’ (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মোজতবাই আইআরজিসি-র প্রথম পছন্দ।
মঙ্গলবার রাতে যখন শিয়া ধর্মতত্ত্বের প্রাণকেন্দ্র কোমে ‘অ্যাসম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর সম্ভাব্য সভাস্থলে ইসরায়েল হামলা চালায়, তখন থেকেই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণে এক ধরনের তাগিদ তৈরি হয়। যদিও হামলার সময় ভবনটি শূন্য ছিল, কিন্তু এই ঘটনা মোজতবার অভিষেক প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, বুধবার সকালের মধ্যেই তাঁর নাম ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা চিন্তা করে কেউ কেউ এখনো সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মোজতবাকে সরাসরি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর এই সম্ভাব্য নির্বাচনকে ‘ইসলামি বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, মোজতবার নির্বাচন এটিই প্রমাণ করবে যে ইরানের শাসনক্ষমতা এখন পুরোপুরি কট্টরপন্থী বিপ্লবী গার্ডের কবজায়।
তবে তেহরানের বিশ্লেষক মেহদি রহমাতি এক ভিন্ন ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মোজতবা হয়তো নিরাপত্তা ও সামরিক সমন্বয়ে সবচেয়ে বিচক্ষণ ব্যক্তি, কিন্তু সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এই ‘বংশানুক্রমিক’ উত্তরাধিকারকে সহজভাবে নেবে না।” বিগত কয়েক মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমনের স্মৃতি ইরানিদের মনে এখনো টাটকা, ফলে মোজতবার ক্ষমতায়ন রাজপথে নতুন করে অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।
৮৮ জন জ্যেষ্ঠ আলেম নিয়ে গঠিত এই বিশেষজ্ঞ পর্ষদ কেবল মোজতবা নয়, বরং আরও কিছু প্রভাবশালী নাম নিয়ে পর্যালোচনায় বসেছে। চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ আলিরেজা আরাফি এবং ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি সৈয়দ হাসান খোমেনি। তবে মোজতবার রাজনৈতিক ওজন ও সামরিক সমর্থন তাঁদের চেয়ে বহুগুণ বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শনিবারের সেই ভয়াবহ হামলায় কেবল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নন, মোজতবার স্ত্রী জাহরা আদেল, মা মানসুরেহ এবং তাঁর এক পুত্রও নিহত হয়েছেন বলে সরকার নিশ্চিত করেছে। শোক আর যুদ্ধের এই আবহে মোজতবা খামেনি কি পারবেন পারস্যের এই বিশাল সাম্রাজ্যের হাল ধরতে, নাকি উত্তরাধিকারের এই লড়াই ইরানকে আরও বড় কোনো অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে—তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
