মাদ্রিদের রাজপথে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে এক আন্দোলনকারী হাতে ধরে আছেন ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে স্পেন’ লেখা প্ল্যাকার্ড। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি আর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চরম হুমকির মুখেও নিজেদের নীতিগত অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছে স্পেন। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় মাদ্রিদের ওপর চটেছেন ট্রাম্প। তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অংশীদার হবে না তার দেশ। বুধবার এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, "মানবতার মহা বিপর্যয় এভাবেই শুরু হয়।"
মাদ্রিদের মালাসানার প্যাট্রন বারে তখন ভিড়। টেলিভিশনের পর্দায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ যখন চলছিল, তখন রেস্তোরাঁর শব্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। নিবিষ্ট মনে সেই ভাষণ শুনছিলেন ৫৩ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জেমা তামারিত। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কড়া অবস্থানের বিপরীতে নিজের দেশের প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ়তায় তিনি গর্বিত।
তামারিত বলেন, “ট্রাম্প একজন পাগল। আমরা তাকে ভয় পাই না। প্রধানমন্ত্রী সানচেজ যে তার অবস্থানের ওপর শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তা স্পেনের জন্য সম্মানের। ইউরোপের অন্য নেতাদেরও উচিত তার পথ অনুসরণ করা।” ইরানের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করলেও তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ইরানের পরিস্থিতি কি যুদ্ধের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব? সংঘাত কখনো সমাধান হতে পারে না।”
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তিনি স্পেনের সাথে সমস্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছেন। ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেটে স্পেনের ব্যয় না বাড়ানো এবং মার্কিন সামরিক কৌশলের বিরোধিতা করায় ট্রাম্পের এই চরম উষ্মা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হওয়ায় স্পেনের বিরুদ্ধে এককভাবে এমন ব্যবস্থা নেওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে।
বার্সেলোনা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বিশেষজ্ঞ ভিক্টর বার্গুয়েট জানান, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যে ট্রাম্পের নির্বিচার শুল্ক আরোপের হুমকিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। তিনি বলেন, “জাতীয় জরুরি অবস্থা প্রমাণ না করে স্পেনের বিরুদ্ধে বড় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। এটি কার্যকর পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক হুমকি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”
স্পেন দীর্ঘ সময় ধরেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের মূলধারার চেয়ে ভিন্ন ও মানবিক অবস্থান নিয়ে আসছে। ইসরায়েলের অস্ত্রবাহী জাহাজকে নিজেদের বন্দরে ভিড়তে না দেওয়া এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সানচেজ সরকার ইতিমধ্যে ট্রাম্পের বিরাগভাজন হয়েছে। আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের সাথে স্পেনও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি স্পেনের রোটা ও মোরন সামরিক ঘাঁটি থেকে ১৫টি মার্কিন বিমান সরিয়ে নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের পারদ আরও নিচে নেমে যায়। স্প্যানিশ সরকার সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো মরণঘাতী হামলায় তাদের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
জরিপ বলছে, স্পেনের অধিকাংশ নাগরিকই ট্রাম্পের উগ্র পররাষ্ট্রনীতির বিরোধী। 'ইউরোবাজুকা'র এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ স্পেনীয় মার্কিন নীতির বিরোধিতা করেন। এছাড়া ৪৮ শতাংশ ইউরোপীয় নাগরিক ট্রাম্পকে 'ইউরোপের শত্রু' হিসেবে গণ্য করেন, যেখানে মিত্র হিসেবে দেখেন মাত্র ১০ শতাংশ।
বাণিজ্যিক তথ্যানুসারে, স্পেনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অঙ্কের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে এককভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করলে মার্কিন অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্পেনের নাম উল্লেখ না করলেও জানিয়েছে, তারা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষায় "পূর্ণ সংহতি" নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।
যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক হুমকির এই দোলাচলে পেদ্রো সানচেজের স্পেন এখন ইউরোপের শান্তিকামী মানুষের এক অনন্য কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা
বিষয় : ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেন
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
