আফগানিস্তানের পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি বিমান হামলার পর ধ্বংসস্তূপের মাঝে প্রিয়জনকে খুঁজছেন সাধারণ মানুষ। সীমান্তের দুই পাশেই এখন বইছে শোক ও যুদ্ধের মাতম। ছবি: এএফপি
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তে শুরু হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। পাকিস্তানের দাবি অনুযায়ী, আফগান ভূখণ্ডে পরিচালিত ‘অপারেশন গজব লিল-হক’-এ এ পর্যন্ত অন্তত ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ৩১৪ জন আহত হয়েছেন। বিপরীতে, তালেবান সরকার এই পরিসংখ্যানকে ভিত্তিহীন দাবি করে পাল্টা হামলায় ৫৫ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে। দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ কেবল সীমান্তেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এখন ড্রোন হামলা ও আকাশপথে বিমান হামলার মাধ্যমে জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সমগ্র অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক ও কৌশলগত সংকটের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে নজিরবিহীন বিমান হামলা শুরু করে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করে জানিয়েছেন, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানের সব পথ ব্যর্থ হওয়ায় তারা এই সামরিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ইসলামাবাদ দাবি করেছে, তাদের অভিযানে তালেবানের ৭৪টি সামরিক চৌকি ধ্বংস এবং বিপুল পরিমাণ ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কাবুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলায় বেসামরিক জনপদ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাতে নারী ও শিশুসহ নিরীহ প্রাণহানি ঘটেছে।
পাকিস্তানের দাবির বিপরীতে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আফগানিস্তানের সামর্থ্য আছে পাকিস্তানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার। আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।” তালেবানের দাবি অনুযায়ী, বুধবার রাত থেকে শুরু হওয়া চার ঘণ্টার এক অভিযানে তারা পাকিস্তানের ১৯টি সামরিক চৌকি ও ২টি ঘাঁটি দখল করেছে। আফগান সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এই হামলাকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিটি ইঞ্চিতে সাহসের সঙ্গে জবাব দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সীমান্তের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি দুই দেশকেই আন্তর্জাতিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। চীন ও রাশিয়া পৃথক বিবৃতিতে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ করে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার তাগিদ দিয়েছে। মস্কো ও তেহরান ইতোমধ্যে সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি টেলিফোন আলাপ করেছেন।
কাবুলের দাশতি বারচি এলাকার এক বাসিন্দা বিবিসির কাছে সেই ভয়াবহ রাতের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম ভূমিকম্প হচ্ছে, কিন্তু জেট বিমানের আওয়াজ শুনে বুঝলাম আমাদের ওপর বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে। সারারাত আমরা আতঙ্কে জেগেছিলাম।” তোরখাম সীমান্ত এলাকায় মুহুর্মুহু মর্টার শেল ও গুলির শব্দে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা আফগানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্ত পথটি এখন কার্যত এক অবরুদ্ধ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
