মণিপুরের বিধ্বস্ত জনপদ এবং বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশে এক বুক হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ মানুষ। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার এবং একসময়ের ‘প্রাচ্যের রত্ন’ মণিপুর আজ এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। দীর্ঘ ২০ মাস ধরে চলা জাতিগত দাঙ্গা, রক্তপাত আর লাশের মিছিল রাজ্যটিকে এমন এক কানাগলিতে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে ‘শান্তি’ শব্দটি আজ কেবল অভিধানের পাতায় বন্দি। ইম্ফল থেকে চূড়াচাঁদপুর—বাতাসে আজ কেবল বারুদের গন্ধ আর আকাশে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়া। ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে মণিপুর আজ কেবল একটি রাজ্যের নাম নয়, বরং এক গভীর ক্ষতের প্রতীক। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—মণিপুর কি কেবল সহিংসতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, নাকি ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে এটিই কোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও শিউরে তুলেছে গোটা ভারতকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুসজ্জিত ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে একদল আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত যোদ্ধা। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্বে থাকা নিয়মিত বাহিনীর এভাবে পিছু হটা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি প্রমাণ করে যে পাহাড়ি অঞ্চলে দিল্লির নিয়ন্ত্রণ এখন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। মণিপুর লিবারেশন আর্মি (এমএলএ) বা কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন আর গেরিলা যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই, তারা সরাসরি রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উন্মুক্ত ময়দানে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হচ্ছে। একে ৪৭-এর গর্জন আর স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের হুংকার আজ মণিপুরের রাজপথে ভারতীয় সংবিধানের শাসনকে একপ্রকার স্তব্ধ করে দিয়েছে।
মণিপুরের অরাজকতা এখন কেবল জাতিগত দাঙ্গায় সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি আঘাত হানছে রাষ্ট্রের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর। ইউনাইটেড কুকি লিবারেশন আর্মি কর্তৃক তিনজন উপজাতি বিধায়ককে পদত্যাগের আল্টিমেটাম এবং অমান্য করলে ‘মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার ঘোষণা একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য চরম অশনিসংকেত। যখন জনগণের প্রতিনিধিকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে সেখানে গণতন্ত্রের স্তম্ভ ধসে পড়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আজ সেখানে নিজেদের সমান্তরাল সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে, যেখানে ভারতের সংবিধান নয়—বরং বন্দুকের নলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘অখণ্ড ভারত’ দর্শন
মণিপুরের এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও রাজনৈতিক ক্ষোভ। ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া জমি বা সংরক্ষণের লড়াই আজ রূপ নিয়েছে ভারতবিরোধী এক বিশাল আন্দোলনে। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লির ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ (অপেক্ষা করো এবং দেখো) নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও অস্ত্র চোরাচালান, অন্যদিকে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ পলিসির জন্য মণিপুর এখন এক বিশাল ঝুঁকি।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ভারতের মূলধারার মিডিয়া যা এড়িয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত হচ্ছে ইলন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে। দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও এই প্রযুক্তির সহায়তায় বিদ্রোহীরা যুদ্ধের ময়দানের চিত্র সরাসরি আপলোড করছে। অনেকেই এই অতি-আধুনিক অস্ত্রের সরবরাহ ও কৌশলের পেছনে শক্তিশালী কোনো বিদেশি শক্তির ছায়া দেখতে পাচ্ছেন। ভারত যখন বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত, তখন খোদ নিজের অন্দরমহল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ইতিহাস সাক্ষী, যে আগুনকে অবহেলা করা হয়, সেই আগুনই একদিন বিশাল দাবানল হয়ে মানচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মণিপুর আজ যা অনুভব করছে, তা কেবল একটি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির জন্য এক মহাবিপদ সংকেত। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটি যদি আজ প্রশাসনিকভাবে ভেঙে পড়ে, তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চলে। প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লির শক্তিশালী সরকার কি তবে অসহায়? নাকি এই রক্তপাত বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই মণিপুরকে গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে? সময় এসেছে সত্যকে স্বীকার করার, কারণ বারুদের স্তূপে বসে শান্তির স্বপ্ন দেখা কেবল অলীক কল্পনা মাত্র।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
