পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থান, দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ছবি: রয়টার্স/ফাইল
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং দুই পরাশক্তির অনমনীয় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে। ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর এমন নজিরবিহীন সমাবেশ আগে দেখা যায়নি। কূটনৈতিক সমঝোতার পথ ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসায় বিশ্বজুড়ে এখন প্রশ্ন—শান্তি নাকি এক প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধ? ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান বর্তমানে যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে সমঝোতার চেয়ে রণদামালাই বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে।
কৌশল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তেহরানের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থাকে ‘অমোঘ’ ধরে নিয়ে ইসরায়েল সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত ছক কষছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো অনির্ধারিত, তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি হবে এক বছরের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় দ্বিতীয় দফার বড় হামলা। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ারের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থানে যেখানে বিশাল বাহিনী মোতায়েনের পর কোনো সাধারণ চুক্তি নিয়ে ফিরে আসা তাঁর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, সামরিক পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত মঙ্গলবার জেনেভায় ‘নির্দেশনামূলক নীতি’ নিয়ে আলোচনার গুঞ্জন উঠলেও মূল সংকট নিরসনে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওমানি মধ্যস্থতাকারীরা ক্ষেপণাস্ত্র সংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে তেহরানে গেলেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি তা পর্যালোচনা করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ইরান তাদের ‘সার্বভৌম অধিকার’ হিসেবে গণ্য করছে। এর বিপরীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি—হয় পারমাণবিক চুক্তি, নয়তো ‘ভয়াবহ পরিণতি’। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প তেহরানকে কার্যত ১০ থেকে ১৫ দিনের একটি প্রচ্ছন্ন সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর জবাবে ইরানও স্পষ্ট করেছে, আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু হলে পেন্টাগন প্রথমেই ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে রেভল্যুশনারি গার্ডসের নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করবে। উদ্দেশ্য—হরমুজ প্রণালি সচল রাখা, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। তবে ইউরোপীয় এবং আরব মিত্ররা ট্রাম্পের এই অভিযানের ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য’ নিয়ে সন্দিহান। এই হামলার উদ্দেশ্য কি কেবল ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করা, নাকি সরাসরি ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’—তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নেতৃত্বাধীন বর্তমান ব্যবস্থায় সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদী অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে পারে।
এদিকে যুদ্ধের এই ঘনঘটার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। ওই বৈঠকের পরই নির্ধারিত হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য—শান্তির টেবিল নাকি ধ্বংসাত্মক রণাঙ্গন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
