বাংলা কথাসাহিত্যের এক স্বর্ণালি অধ্যায়ের অবসান ঘটল। পাঠকহৃদয়ে চিরকালীন আসন গেড়ে বসা কালজয়ী কথাশিল্পী মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘শংকর’ নামেই সমধিক পরিচিত, তিনি পাড়ি জমালেন অমৃতলোকে। শুক্রবার দুপুরে ৯২ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি সাহিত্যিক। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের একটি যুগের যবনিকাপাত হলো।
হাওড়ার এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অসামান্য ব্যক্তিত্বের জীবনসংগ্রাম ছিল রূপকথার মতোই রোমাঞ্চকর। জীবিকার তাগিদে কলকাতার রাজপথে দিনাতিপাত করা শংকর এক সময় যুক্ত হয়েছিলেন কলকাতার শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ‘ক্লার্ক’ বা জুনিয়র হিসেবে। বারওয়েল সাহেবের মৃত্যুর পর সেই বিয়োগব্যথা থেকেই কলম ধরেন তিনি; জন্ম নেয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত সেই অনবদ্য সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে তাঁর আগমণী বার্তা ঘোষণা করেছিল।
শংকরের লেখনী কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছুঁয়ে গিয়েছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির নাড়ির স্পন্দনকে। ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জনঅরণ্য’—তাঁর প্রতিটি উপন্যাস যেন সমসাময়িক সমাজের এক জীবন্ত আখ্যান। কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় তাঁর একাধিক সৃষ্টিকে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করেছেন। কেবল কথাসাহিত্য নয়, ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’-এর মতো গবেষণাধর্মী রচনায় তিনি ভক্ত ও পাঠকদের উপহার দিয়েছেন এক নতুন দ্রোহী ও মানবিক বিবেকানন্দকে। ডিজিটাল যুগের অস্থির সময়েও শংকরের গদ্যশৈলী ও রসবোধ প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে একইভাবে প্রাসঙ্গিক থেকেছে।
শংকরের প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে সাহিত্য জগতের এক নক্ষত্রের পতন হলো। তাঁর অভাব কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।” দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি ২০০৩ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার’, সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’সহ অসংখ্য রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যের বাইরে তিনি এক সময় কলকাতার ‘শেরিফ’ পদের মতো অলংকৃত আসনেও আসীন ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে গত বছর পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর থেকেই তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল। চলতি মাসের শুরুতে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও এবার আর জগতজোড়া পাঠকদের ভালোবাসায় ফেরা হলো না তাঁর। রেখে গেলেন এক বিশাল শূন্যতা এবং বিপুল সাহিত্যসম্ভার।