আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী তালেবানের ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কোন্দল ও ক্ষমতার চরম দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি বিবিসির এক বছরব্যাপী অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার একক কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো একজোট হয়ে ‘বিদ্রোহ’ করেছে কাবুলের শক্তিশালী একটি গোষ্ঠী। এমনকি আখুন্দজাদার জারি করা ‘ইন্টারনেট বন্ধের’ নির্দেশ অমান্য করে তা পুনরায় চালু করার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে।
২০২৫ সালের শুরুতে কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় দেওয়া আখুন্দজাদার এক গোপন অডিও বার্তা ফাঁস হওয়ার পর থেকেই তালেবানের অভ্যন্তরীণ ফাটল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অডিওতে তাকে সতর্ক করতে শোনা যায় যে, "সরকারের ভেতরের লোকজন একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। এই বিভাজনই একসময় ইসলামি আমিরাতকে ধ্বংস করে দেবে।" তালেবান নেতৃত্ব বরাবরের মতো এই বিভক্তির কথা অস্বীকার করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তালেবানের মধ্যে এখন স্পষ্ট দুটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়: ১. কান্দাহার গোষ্ঠী: হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুগত এই অংশটি কঠোর কট্টরপন্থী এবং আধুনিক বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক আফগানিস্তান চায়। যেখানে নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে। ২. কাবুল গোষ্ঠী: এই অংশে রয়েছেন প্রভাবশালী নেতা মোল্লা বারাদার, সিরাজউদ্দিন হাক্কানি এবং ইয়াকুব মুজাহিদ। তারা বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত। তারা ইসলামের অনুসরণ করলেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, অর্থনীতি সচল রাখা এবং নারী শিক্ষার বিষয়ে কিছুটা নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আখুন্দজাদা পুরো দেশে ইন্টারনেট ও টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ দেন। তার বিশ্বাস ছিল, ইন্টারনেট ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। কান্দাহার থেকে জারি করা এই নির্দেশের পর আফগানিস্তান কার্যত বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী মনে করে কাবুল গোষ্ঠী। তিন দিন পর মোল্লা বারাদার, হাক্কানি ও ইয়াকুব একজোট হয়ে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে এই নির্দেশ বাতিল করিয়ে পুনরায় ইন্টারনেট চালু করেন। বিশ্লেষকদের মতে, আমিরের সরাসরি আদেশের বিরুদ্ধে এটি ছিল এক প্রকার ‘বিদ্রোহ’।
২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আখুন্দজাদা কৌশলে তার দুই ডেপুটি হাক্কানি ও ইয়াকুবকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেন। তিনি কাবুল এড়িয়ে কান্দাহার থেকে শাসন পরিচালনা শুরু করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সব বিভাগ (যেমন অস্ত্র বিতরণ ও নিরাপত্তা বাহিনী) নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি এখন অধিকাংশ মন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ পর্যন্ত করেন না।
তালেবানের দুই শীর্ষ নেতা সিরাজউদ্দিন হাক্কানি এবং নেদা মোহাম্মদ নাদেমের সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। হাক্কানি যখন জনগণের আস্থা অর্জনের কথা বলছেন, তখন আখুন্দজাদার অনুগত নাদেম বলছেন—"একজনের আদেশই চূড়ান্ত, ভিন্ন মত মানেই ধ্বংস।"
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে কাবুল গোষ্ঠী কি কেবল মৌখিক আপত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তারা আফগান জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে আখুন্দজাদার কঠোর শাসনের বিরুদ্ধে বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে?
সূত্র: বিবিসি
বিষয় : আফগানিস্তান তালেবান এশিয়া
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
