পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার আরজে কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাকে ঘিরে আন্দোলন ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে। চিকিৎসকরা ছাড়াও নানা শ্রেণিপেশার মানুষ বিচারের দাবিতে পথে নেমেছে।
এ ঘটনা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। রাজ্যে নারীদের সুরক্ষা, এই ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা, ‘রাত দখলের’ কর্মসূচি চলাকালীন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভাঙচুরের মতো একাধিক ইস্যু নিয়ে বিজেপিসহ বিরোধী দলগুলো যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর ইস্তফা দাবি করেছে, তেমনই তৃণমূলের অন্দরমহলেও কেউ কেউ সরব হয়েছেন দলের বিরুদ্ধে।
এই বিষয়ে বিজেপির প্রধান বিরোধী জোট ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের অবশ্য দেখা গিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করতে। জোট শরিক কংগ্রেস রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলতে পিছুপা হয়নি। আবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর পাশে দাঁড়িয়েছে সমাজবাদী পার্টি এবং আম আদমি পার্টি ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইন্ডিয়া জোটের শরিকদের মধ্যে এই বিভাজনের’ কারণ রয়েছে। কংগ্রেস যেমন নারী এবং যুবসমাজকে মাথায় রেখে মন্তব্য করেছে, তেমনই সমাজবাদী পার্টি বা আম আদমি পার্টি জোট শরিকদের মাঝের সমীকরণকে ব্যালেন্স করে চলতে চায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথ বলেছেন, এখনও পর্যন্ত ইন্ডিয়া জোটে শরিকদলগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে। তার একটাই কারণ রাজনীতি। প্রত্যেকটা দল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণকে মাথায় রেখে আরজি করে চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা প্রসঙ্গে কথা বলছে।”
কংগ্রেস কী বলেছে: আরজি করের ঘটনা পর আসার পর সরব হন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। যাকে ঘিরে আরও একবার প্রকাশ্যে চলে আসে জোটে থাকা দুই শরিক তৃণমূল ও কংগ্রেসের টানাপোড়েন’।
এক্স হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী লিখেছিলেন, কলকাতায় এক জুনিয়র চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের জঘন্য ঘটনায় হতবাক গোটা দেশ। যেভাবে তার উপর নৃশংস এবং অমানবিক অত্যাচার হয়েছে, তাতে চিকিৎসক সমাজে এবং নারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ স্পষ্ট।’’
এই ঘটনায় বিরোধীদের মতোই রাজ্যকে নিশানা করেন তিনি। তার মতে, “ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে অভিযুক্তকে বাঁচানোর চেষ্টা হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসন সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে, মেডিক্যাল কলেজের মতো জায়গায় যদি চিকিৎসকেরা নিরাপদ না থাকেন, তা হলে অভিভাবকেরা কোন ভরসায় তাদের মেয়েকে পড়তে পাঠাবেন?’’
উত্তরপ্রদেশের হাথরস, উন্নাও এবং জম্মু ও কাশ্মীরের কাঠুয়া ধর্ষণকাণ্ডের সঙ্গেও আরজি করের ঘটনার তুলনা টেনেছেন রাহুল। তার মতে, “হাথরস থেকে উন্নাও এবং কাঠুয়া থেকে কলকাতা পর্যন্ত মহিলাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অপরাধের ঘটনার বিষয়ে, প্রত্যেকটা দল এবং সমাজের প্রতিটা অংশকে গুরুত্ব সহকারে একসঙ্গে আলোচনা করতে হবে এবং দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।”
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশ বিজেপি শাসিত এবং জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্র শাসিত। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এই ঘটনাগুলোর তুলনা টেনে রাহুল গান্ধী সরাসরি মমতা সরকারকেই বিঁধতে ছেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১২ সালে দিল্লির গণধর্ষণ এবং হত্যা মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “নির্ভয়া মামলার পর তৈরি হওয়া কঠোর আইনও কেন এই ধরনের অপরাধ বন্ধ করতে ব্যর্থ?”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ছত্তিশগড়ের কংগ্রেস নেতা টিএস সিং দেও। বার্তাসংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনায় জনতার এই প্রতিক্রিয়া খুব স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ভুক্তভুগী এবং তার পরিবারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ।”কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জাতীয় ঘটনা নিয়েও আমরা রাজনীতি করতে দ্বিধা বোধ করি না…এইভাবে চলতে থাকলে এমন ঘটনায় তদন্ত চাওয়ার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি চাওয়াটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়াবে…।”
তদন্তে কোনও গাফিলতি থাকলে তা যে মেনে নেওয়া যাবে না, তাও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বলেছেন,তদন্তের ক্ষেত্রে যদি কোনোরকম শিথিলতা থাকে তাহলে তা আপত্তিকর। ছত্তিশগড়ে আমাদের (কংগ্রেসের) ইস্তেহারে আমরা আইনজীবী, চিকিৎসক এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য পৃথক বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম।”
রাজ্যে ভিন্ন সমীকরণ: পশ্চিমবঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের শরিক কংগ্রেস এবং বামদের সঙ্গে তৃণমূলের কোনো যোগ নেই সেই কথা বারবার প্রকাশ্যে দাবি করে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরীও তৃণমূলের সমালোচনা করে এসেছেন।
আরজি করে হামলার পর অধীর রঞ্জন চৌধুরী বলেন, “মমতা ব্যানার্জীর নির্দেশে পুলিশ এবং তৃণমূল আশ্রিত গুণ্ডা একসঙ্গে আক্রমণ করছে এই আন্দোলনকে ভেঙে দেওয়ার জন্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যিনি রাজ্যের রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও, তার পদত্যাগ চেয়ে আগেই পথে নেমেছে বাম এবং কংগ্রেস।
সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ ইয়াদব কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজে একজন নারী। তিনি নারীর যন্ত্রণার কথা বোঝেন, তিনি ব্যবস্থা নিয়েছে।
আম আদমি পার্টির নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় সিং জানিয়েছেন, “এখন মামলাটা সিবিআইয়ের কাছে রয়েছে এবং মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তাদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে তিনি কেন্দ্রের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন। মি. সিং বলেন, “মোদী সরকার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী কোটি কোটি নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য কী করেছে? কেন কড়া আইন কার্যকর করে নারীদের সুরক্ষা বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা নেয়নি?”
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন অবশ্য বিতর্ক এড়াতে চেয়েছেন। শরিকদল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার এই নেতা বলেছেন, বাংলার ঘটনার নিন্দা করার জন্য কোনও নিন্দাই যথেষ্ট নয়।
তৃণমূলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া: রাহুল গান্ধীর মন্তব্যের পর কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার পাল্টা অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
তৃণমূলের কুণাল ঘোষ কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সরাসরি রাহুল গান্ধীকে প্রশ্ন করেন, তাহলে রাহুল গান্ধী আপনি কি আপনার মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলবেন? এটা একটা বড় দুর্নীতির অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে তিনি একই সঙ্গে লিখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ঘটনা সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জেনে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে না জেনেই আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করেছেন।
তৃণমূলের অন্দরমহলে দ্বন্দ্ব: চিকিৎসককে খুনের ঘটনায় তৃণমূলের অন্দরমহলের একাধিক নেতা ভিন্ন মত করেছেন।মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত সঠিক খবর পৌঁছচ্ছে না’ এই মন্তব্য করে দলের রোষানলে পড়েন শান্তনু সেন।
অন্যদিকে, তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ শুখেন্দুশেখর রায় শনিবার মধ্যরাত থেকে একের পর এক প্রশ্ন তোলেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, কারা আত্মহত্যার কথা রটিয়েছিল, কেন ৩দিন পরে ঘটনাস্থলে স্নিফার ডগ? কেন দেওয়াল ভাঙা হলো?
বিবিসি বাংলা অবলম্বনে
বিষয় : ভারত
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
