হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হামাক্রান্ত শিশু। ছবি: সংগৃহীত
টিকার ভুয়া শতভাগ কাভারেজ দাবি, হাম মোকাবিলায় জাতীয় গাইডলাইনের চরম অভাব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চরম উদাসীনতায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ছয়জন শিশুর প্রাণ কাড়ছে মারাত্মক ছোঁয়াচে ব্যাধি হাম। রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অ্যান্টিবডি পরীক্ষা না করা এবং বাদ পড়া লাখ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে না পারায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। গত ১৫ মার্চ থেকে জুলাই মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ১৩৯ দিনে দেশজুড়ে সরকারি হিসেব ও হাসপাতাল তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৮৩৭ জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের তথ্যমতে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪,১২৮ জনে, যা প্রাদুর্ভাবের প্রথম মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দেশে এপর্যন্ত মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৩১০ জন আক্রান্ত হলেও প্রথম ৩০ দিনের গড় মৃত্যুর হার (দৈনিক ৬.৬ জন) এবং সংক্রমণ বৃদ্ধির হার পঞ্চম মাসে এসেও অপরিবর্তিত রয়েছে। দুটি নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দলের মতে, দেশে উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা প্রতিটি শিশুই প্রকৃত অর্থে হামে আক্রান্ত। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১০৪ শতাংশ কাভারেজ (১ কোটি ৮৭ লাখ শিশু) দাবি করা হলেও জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের 'ভিটামিন এ' ক্যাপসুল কর্মসূচির তথ্যে দেখা যায়, একই বয়সী প্রায় ৩৮ লাখ ৮২ হাজার শিশু আসলে হামের টিকা থেকেই বাদ পড়েছে।
অভিযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিষয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সাবেক কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, "বর্তমান সরকারের দেখানো টিকার কাভারেজ তথ্য সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর। ২০১০ সালের পুরনো লক্ষ্যমাত্রায় টিকাদান করায় অন্তত ৩৮ লাখ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে। একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে সুরক্ষিত না করা পর্যন্ত এই প্রাদুর্ভাব থামানো অসম্ভব। দ্রুত টিকা নেওয়া শিশুদের রক্তের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা এবং বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা ছাড়া বর্তমান সংকট কাটার কোনো লক্ষণ নেই।"
পরিস্থিতির ভয়াবহতার বিপরীতে সরকারের কৌশলগত ঢিলেমি প্রকাশ পেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান দাবি করেন, "সংক্রমণ কিছুটা কমেছে এবং আগামীতে আরও নিয়ন্ত্রণে আসবে। যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তারা নিউমোনিয়ায় না হামে মারা যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে বিভাগীয় পরিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।" তবে অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল স্বীকার করেছেন যে, ২০২০ সালের পর দীর্ঘ চার বছর ক্যাম্পেইন না হওয়ায় আক্রান্তদের ৯৯ শতাংশই অনভ্যাক্সিনেটেড এবং তাদের নতুন করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, গত এপ্রিল মাসে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির তৈরি করা জাতীয় চিকিৎসার গাইডলাইন গত চার মাসেও অনুমোদন না পাওয়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে একই ধরনের সঠিক চিকিৎসা প্রটোকল বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনতিবিলম্বে মাঠপর্যায়ে মাইকিং ও বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দান, জাতীয় চিকিৎসা গাইডলাইন অনুমোদন এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে রক্তে ১২০ মিলি/লিটার অ্যান্টিবডি উপস্থিতি পরীক্ষা না করা হলে সামনের দিনগুলোতে এই প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব আরও দীর্ঘায়িত হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
রিলায়েন্ট মিডিয়া
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
