দেশের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি সংক্রমণের বিস্তার রোধে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি সতর্কতা। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয় এবং ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা সমষ্টিগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশে শিশুদের পাশাপাশি এবার প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও আশঙ্কাজনকভাবে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে রোববার পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তত ৪৫৯টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৫৮ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য নিশ্চিত করে টিকার তীব্র ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুড়ি বছরের বেশি বয়সীদের হামে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন নিয়মিত টিকাদানে ব্যাঘাত এবং বিশ্বব্যাপী টিকা-বিরোধী প্রচারণার কারণে গত ২০ বছরের মধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বাংলাদেশও এই বৈশ্বিক সংকটের বাইরে নেই। গত কয়েক বছরে শিশুদের নিয়মিত হামের টিকা না দেওয়াই বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে শিশুদের পাশাপাশি ১২ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ‘ইনফেকশাস ব্লক’ চালু করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক হামের রোগী আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, "বর্তমানে ৫ থেকে ৬ জন বয়স্ক রোগী আমাদের এখানে চিকিৎসাধীন আছেন। বড়দের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ দেখা গেলেও তা গুরুতর নয় এবং যথাযথ চিকিৎসায় তারা দ্রুত সেরে উঠছেন। এই মুহূর্তে আমরা শিশুদের চিকিৎসাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।"
যদিও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মদ শফি জানিয়েছেন, ঢাকার মাঠপর্যায় থেকে বড়দের হামে আক্রান্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত রিপোর্ট এখনো তাদের কন্ট্রোল রুমে পৌঁছায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ টিকার আওতায় থাকলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র কারণে সংক্রমণ ছড়াতে পারে না। কিন্তু বর্তমান টিকাদানের ঘাটতি সেই সুরক্ষাবলয় ভেঙে দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "সাধারণত বড়দের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকায় তারা সহজেই হাম থেকে সেরে ওঠেন। তবে যারা ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন, কিডনি ডায়ালিসিস করাচ্ছেন কিংবা যক্ষ্মা ও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণের কারণে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, হামের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কেবল তারাই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।"
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান (ইপিআই) কর্মসূচির আওতায় শিশুদের হামের টিকার বয়স ৯ মাস থেকে এগিয়ে ৬ মাসে আনা হয়েছে। এছাড়া আগামী মাস থেকে দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর পাশাপাশি নতুন করে গণ-টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ আশা করছে, দ্রুততম সময়ে ৮০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হলে পুনরায় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং সংক্রমণের এই মারাত্মক ধারাটি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
