হাসপাতালের চিকিৎসাধীন এক শিশু। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের একসময়ের সফল অর্জন ‘হাম নির্মূল কর্মসূচি’ এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ করেই শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। টিকার আওতায় থাকা সত্ত্বেও শিশুদের এই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া এবং গত এক মাসে অন্তত ২০টি শিশুর মৃত্যুর খবর জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, গত আট বছরের ‘টিকাদান স্থবিরতা’ এই সংকটের মূল কারণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সংক্রমণের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়া। সাধারণত ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৯ মাস বয়সে প্রথম টিকা দেওয়া হয়, কিন্তু বর্তমানে আক্রান্তদের ৩৩ শতাংশই এই নির্দিষ্ট বয়সের ছোট। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের মধ্যে শিশুদের মৃত্যু এবং ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বছরের শুরু থেকে চার শতাধিক রোগী ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত পরীক্ষায় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিপুল সংখ্যক হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল রোববার এক অনুষ্ঠানে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, গত আট বছর ধরে এই অতি সংক্রামক রোগের বিশেষায়িত টিকাদান কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারি এবং ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রতি চার বছর অন্তর যে বিশেষ হামের টিকা কর্মসূচি নেওয়ার কথা ছিল, তা ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া শিশুদের অপুষ্টি, মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত পান না করানো এবং কৃমিনাশক ওষুধের অভাবকে এই প্রকোপের পেছনে দায়ী মনে করছেন চিকিৎসকরা।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত ভ্যাকসিনের মান এবং ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে জানিয়েছেন, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে অন্তত ১৮ জন সংক্রমিত হতে পারে। এর প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে তীব্র জ্বর, কাশি এবং চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। হামের ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। বিশেষ করে যারা পুষ্টিহীনতায় ভুগছে, তাদের জন্য এই রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ জুলাই-আগস্ট মাসে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরুর পরিকল্পনা করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জোট ‘গ্যাভি’-কে টিকার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে এবং মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ২ কোটি সিরিঞ্জ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এছাড়া ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামের রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার ও ভেন্টিলেটরযুক্ত আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে। বড় ১০টি মেডিকেল কলেজেও খোলা হয়েছে বিশেষ ওয়ার্ড।
হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও শিশুদের এই অকাল মৃত্যু দেশের টিকাদান ব্যবস্থার ফাঁকফোকরগুলোকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কেবল জরুরি বরাদ্দ বা সাময়িক ক্যাম্পেইন নয়, বরং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং প্রান্তিক পর্যায়ে পুষ্টি নিশ্চিত করাই এই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তির একমাত্র পথ। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নিলে এই ছোঁয়াচে ব্যাধি জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
