রোজাদারের শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি ও পুষ্টির জোগান দেয় খেজুর। ছবি: সংগৃহীত
সূর্যাস্তের রাঙা আভায় যখন মুয়াজ্জিনের আজান ধ্বনিত হয়, বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ইফতারের টেবিলে একটি ফল অবধারিতভাবে উপস্থিত থাকে—খেজুর। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে শুরু হওয়া এই রীতির পেছনে কেবল ধর্মীয় আবেগ নয়, বরং লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর চিকিৎসাবিজ্ঞান। দীর্ঘ ১৫-১৬ ঘণ্টার উপবাসের পর মানবদেহের জৈবিক চাহিদা পূরণে খেজুরের চেয়ে আদর্শ খাবার আর দ্বিতীয়টি নেই।
সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকার ফলে শরীরের কোষে গ্লুকোজের ঘাটতি দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা পুষ্টিবিদ শাহনাজ বশিরের মতে, "ইফতারের মুহূর্তে শরীর দ্রুত জ্বালানি বা শক্তির খোঁজ করে। খেজুর এমন একটি অনন্য ফল যা প্রাকৃতিক চিনি এবং জটিল কার্বোহাইড্রেটের এক শক্তিশালী সংমিশ্রণ।"
এটি রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত দ্রুত এবং ভারসাম্যপূর্ণভাবে বাড়িয়ে শরীরকে তাৎক্ষণিক চনমনে করে তোলে। এছাড়া খেজুরে বিদ্যমান ভিটামিন এ, কে, বি-৬ এবং আয়রন রোজাদারের সারা দিনের পুষ্টির ঘাটতি নিমিষেই পূরণ করতে সক্ষম।
খেজুর যদিও একটি শুষ্ক ফল, তবে এটি কোষকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষমতাসম্পন্ন। এতে থাকা প্রচুর পরিমাণ পটাশিয়াম শরীরের কোষগুলোতে ‘পানির চুম্বক’ হিসেবে কাজ করে। ইফতারে খেজুরের সাথে পানি পান করলে তা দ্রুত শরীরে পানির ভারসাম্য (হাইড্রেশন) ফিরিয়ে আনে। পুষ্টিবিদদের মতে, খেজুর খাওয়ার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃত্রিম ইলেক্ট্রোলাইট বা এনার্জি ড্রিঙ্কের আর কোনো প্রয়োজনই থাকে না।
রমজানে অনেকের মধ্যেই ইফতারের পর অতিভোজনের প্রবণতা দেখা দেয়, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। ইসলামি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সাধারণত বিজোড় সংখ্যায় (১, ৩ বা ৫টি) খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। উচ্চ ফাইবার বা তন্তুজাতীয় এই ফলটি হজম প্রক্রিয়ার সংকেত মস্তিষ্ককে দ্রুত পাঠিয়ে দেয়, ফলে খাওয়ার তৃপ্তি আসে দ্রুত এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের স্পৃহা কমে যায়। এটি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতেও বিশেষ সহায়ক।
রোজাদারদের মধ্যে রমজানে কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই সাধারণ। খেজুর ফাইবারের একটি সমৃদ্ধ উৎস হওয়ায় এটি পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে এবং অন্ত্রের বর্জ্য অপসারণ প্রক্রিয়াকে সহজতর করে। ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) যেখানে দৈনিক ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দেয়, সেখানে প্রতিদিনের ইফতারে খেজুর রাখা হতে পারে এর সবচেয়ে সহজ সমাধান।
বিশ্বজুড়ে শত শত প্রজাতির খেজুর পাওয়া যায়—কোনোটি নরম, কোনোটি শক্ত বা ছিবড়াযুক্ত। ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী খেজুরের ধরনে পরিবর্তন আনা সম্ভব। যারা সরাসরি খেজুর খেতে অপছন্দ করেন, শাহনাজ বশির তাদের জন্য ‘স্মুদি’ বা শরবতের পরামর্শ দিয়েছেন। দুধ, দই এবং সামান্য বাদামের সাথে খেজুর ব্লেন্ড করে তৈরি করা পানীয় সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে মহৌষধ হিসেবে কাজ করে।
বস্তুত, খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেবল একটি প্রাচীন প্রথা নয়; বরং এটি দীর্ঘ সময়ের উপবাসের পর শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখার এক বিজ্ঞানসম্মত সঞ্জীবনী সুধা।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
