ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে মধ্যপ্রাচ্যের রণকৌশল এখন কেবল স্থলভাগ বা আকাশসীমায় সীমাবদ্ধ নেই; তা বিস্তৃত হয়েছে সমুদ্রের অতল গহ্বরে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং লোহিত সাগরের তলদেশে থাকা সাবমেরিন কেব্ল বিচ্ছিন্ন করার প্রচ্ছন্ন হুমকি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট’ বা মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। যদি এই সাবমেরিন কেব্লগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কেবল জ্বালানি সংকট নয়, বরং স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে বৈশ্বিক আর্থিক লেনদেন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
বিশ্বের মোট ইন্টারনেট ট্রাফিকের প্রায় ১৭ শতাংশ লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী এই কেব্লগুলো অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ ডেটা আদান-প্রদান পরিচালনা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি সরাসরি কিংবা তাদের মিত্র হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ‘বাব এল-মানদেব’ বা হরমুজ প্রণালির নিচের এই স্নায়ুকেন্দ্রগুলো বিচ্ছিন্ন করে, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক মারিও নাউফালের মতে, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো টেক জায়ান্টদের সমর্থিত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘এআই হাব’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্রগুলো এই নেটওয়ার্কের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ইন্টারনেট বিভ্রাট কয়েক ঘণ্টা নয়, বরং কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যা আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতাকে এক লহমায় কয়েক দশক পিছিয়ে দেবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ক্লাউড সার্ভিস, ভিডিও কল, ই-মেইল থেকে শুরু করে জটিল আর্থিক লেনদেন—সবই এই সাবমেরিন কেব্লের ওপর দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে বিশ্বের উদীয়মান এআই অবকাঠামোগুলো এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। কোনো কারণে এই অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে সরাসরি ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও ইরানের সরকারি সূত্র বা কোনো আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য সংস্থা এই হুমকির বিষয়টি দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করেনি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্লেষণ বিশ্বনেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। জ্বালানি তেলের সংকটের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে এই ‘ডেটা ডার্কনেস’, যা আধুনিক বিশ্বের স্নায়ুতন্ত্রকে অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে