ক্যাপসিকাম।
উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসা এক রঙিন সবজি এখন বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। চোখ ধাঁধানো রং আর আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে অপরিহার্য হয়ে ওঠায় ‘ক্যাপসিকাম’ বা মিষ্টি মরিচ এখন কেবল সুপারশপের শৌখিন পণ্য নয়, বরং প্রান্তিক কৃষকের কাছে এক লাভজনক ‘ক্যাশ ক্রপ’ বা অর্থকরী ফসল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। গত তিন বছরে দেশে এর উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি, যা দেশের উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্য বা 'হাই-ভ্যালু ক্রপ' হিসেবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
পিজ্জা, সালাদ কিংবা বিদেশি ফাস্টফুড আইটেমে ক্যাপসিকামের ব্যবহার বাংলাদেশে একটি স্থায়ী বাজার তৈরি করেছে। কৃষি বিভাগের টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, "আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে এটি একটি অপরিহার্য উপাদান। শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে এখন মফস্বলেও এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে চাহিদা তৈরি হয়েছে।" এই সবজিতে থাকা ভিটামিন এ, সি এবং কোলাজেন মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও ত্বকের যত্নে জাদুর মতো কাজ করে।
পরিসংখ্যান ও ফলনের মানচিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়:
উৎপাদন চিত্র
২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ১৫০ টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৪৭৫ টনে।
উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু
দেশের মোট উৎপাদনের সিংহভাগ অর্থাৎ ৫৫ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে ভোলার উপকূলীয় মাটিতে। এছাড়া যশোর, নওগাঁ এবং চুয়াডাঙ্গাতেও এর বাণিজ্যিক চাষ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিচিত্র রং
বাজারে সবুজ ক্যাপসিকাম বেশি দেখা গেলেও হলুদ, লাল, কমলা এমনকি বেগুনি ক্যাপসিকামের চাহিদা ও দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।
যশোরের শার্শা অঞ্চলের সফল চাষি মানিক রাজা জানান, শুরুতে ৬-৭ বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি ৩৫ লাখ টাকার ফলন ঘরে তুলেছিলেন। বর্তমানে ১৪ বিঘা জমিতে চাষ করা এই কৃষক বলেন, "একবার পলিহাউজ বা নেটহাউজ তৈরি হয়ে গেলে পরের বছর খরচ অনেক কমে যায়। মাঠ থেকেই প্রতি কেজি হলুদ বা লাল ক্যাপসিকাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।" একই জমিতে ফসল পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি টমেটো বা ব্রোকলি চাষ করে মাটির উর্বরতাও বজায় রাখছেন।
ক্যাপসিকাম মূলত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষযোগ্য ফসল। পলিনেট বা গ্রিনহাউজে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে এর উন্নত মান নিশ্চিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যে তিন ধরনের উন্নত বীজ উদ্ভাবন করেছে, যা বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি হেক্টরে ৩০-৩৫ টন ফলন পাওয়া সম্ভব, যা থেকে একজন কৃষক ১৪ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। তবে এটি বেশ শ্রমসাধ্য, কারণ নিখুঁত ফলন পেতে কৃষকদের সারা মৌসুম মাঠেই সময় কাটাতে হয়।
বাংলাদেশে ক্যাপসিকামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা কেবল শখের কৃষিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানিযোগ্য ফসল হিসেবে গড়ে ওঠার দাবি রাখে। পলিহাউজ প্রযুক্তির বিস্তার এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে এই রঙিন সবজি বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ অচিরেই ক্যাপসিকাম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এগোচ্ছে, যা স্মার্ট কৃষির এক অনন্য উদাহরণ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
