× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

‘পুশইন’ ইস্যুতে দিল্লি বৈঠক ব্যর্থ

যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই ফিরল বিজিবি, তীব্র মতপার্থক্য

ন্যাশনাল ট্রিবিউন প্রতিবেদক

১৩ জুন ২০২৬, ১৬:৫৩ পিএম । আপডেটঃ ১৩ জুন ২০২৬, ১৮:৫৮ পিএম

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক।

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী শীর্ষ বৈঠক কোনো প্রকার সমঝোতা ছাড়াই ব্যর্থ হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক রূপ নেয় যে, চার দিনের নিবিড় আলোচনার পরও দীর্ঘদিনের প্রচলিত ঐতিহ্য ভেঙে কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের জন্য পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং সেখানেও সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে মূল সংকটজনক ‘পুশইন’ প্রসঙ্গটি।

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত সংকটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) একতরফা নীতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। 

সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও সীমান্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, চার দিনের এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তে 'পুশইন' ও 'পুশব্যাকের' অনমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করা হলে আলোচনার টেবিলে প্রবল অচলাবস্থা তৈরি হয়। বিএসএফের দাবি, ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে তীব্র ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর আটক ব্যক্তিরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং তারা অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন। ফলে ভারতের ভূখণ্ডে অবৈধভাবে অবস্থানকারী এসব ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিতে ঢাকার আপত্তি কেন—সেই প্রশ্ন তোলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

বিএসএফের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয় যে, বাংলাদেশ যথাযথভাবে নিজেদের নাগরিকদের গ্রহণে সহযোগিতা না করায় তারা সীমান্তে ‘পুশব্যাক’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পুরো প্রক্রিয়ার সমস্ত দায় ও ব্যর্থতা একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। যা বৈঠকের পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে।

ভারতীয় বাহিনীর এই অবস্থানের জবাবে বিজিবির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বৈঠকে অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করা হলে তাকে আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) বা প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বিধিমালা রয়েছে। সেই আইনি প্রক্রিয়া ও প্রোটোকল সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে গোপনে ও জোরপূর্বক অন্ধকার সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক সমঝোতার পরিপন্থি।

দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী, ভারতে কোনো ব্যক্তি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আটক হলে এবং তিনি নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করলে, তার নাম-ঠিকানা ও অন্যান্য আইনি প্রমাণাদি যাচাইয়ের জন্য প্রথমে বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তার নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলে নির্ধারিত সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে হস্তান্তর করা হয়।

বিজিবির প্রতিনিধি দল বৈঠকে আরও উল্লেখ করে যে, ভারত যাদের সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা আদুও বাংলাদেশের নাগরিক কি না। তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা বা অকাট্য প্রমাণ ভারতীয় পক্ষ দিতে পারছে না। এমনকি তাদের পরিচয় বা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কোনো প্রাথমিক তথ্য বা ডাটাবেজও বাংলাদেশের সাথে ভাগাভাগি করা হচ্ছে না। এমতাবস্থায়, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ আইনি যাচাই-বাছাই ও নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রহণ করা বাংলাদেশের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বৈঠকের একপর্যায়ে বিজিবি অতীতে ভারতীয় নাগরিকদের ভুলবশত বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার একাধিক স্পর্শকাতর দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা ভুলের কারণে সুনালি খাতুন ও সাকিনা বেগমের মতো প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের যেভাবে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ভারতকে যেভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঢাকাকে যাচাই ছাড়া কাউকেই গ্রহণ না করার যৌক্তিকতা প্রমাণ করা হয়।

বৈঠকে বিএসএফ প্রতিনিধি দল বলেন, "মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর ধরে কোনো ব্যক্তিকে আমাদের দেশের জেলখানা বা হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পক্ষ তথ্য যাচাই ও চূড়ান্ত जवाब দিতে দীর্ঘ সময় নেয়, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সংকট তৈরি করছে।"

তবে বিএসএফের এই অভিযোগের বিপরীতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছে, প্রায় দুই হাজার আটক ব্যক্তির নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এই প্রশাসনিক ধীরগতিকেই বিএসএফ তাদের একতরফা পুশব্যাকের অন্যতম কারণ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে।

দিল্লির এই শীর্ষ বৈঠক সীমান্ত পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করার পরিবর্তে সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। এর আগে ২০২৫ সালেও দুই বাহিনীর শীর্ষ বৈঠকে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ইস্যুতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। যার ধারাবাহিকতা এবার 'পুশইন' ইস্যু পর্যন্ত গড়াল।

দিল্লিভিত্তিক বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামী এই সীমান্ত অচলাবস্থাকে কেবল সামরিক বা রক্ষী বাহিনীর স্তরের সমস্যা হিসেবে দেখতে নারাজ। সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।

সুকল্যাণ গোস্বামী বলেন, "দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মূলত নিজ নিজ সরকারের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তেরই মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে থাকে। ফলশ্রুতিতে, উচ্চ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো টেকসই সমাধান আসবে। ততক্ষণ সীমান্তে এই গভীর অচলাবস্থা ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো সম্ভব নয়।"

সীমান্তের বর্তমান থমথমে পরিস্থিতি এবং দিল্লির এই নিষ্ফলা বৈঠকের পর কূটনৈতিক মহল মনে করছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সংকট নিরসনে এখন দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কার্যকরী সদিচ্ছা ছাড়া সাধারণ সীমান্ত ফ্ল্যাগ মিটিং বা মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক দিয়ে উদ্ভূত সংকটের স্থায়ী সমাধান সুদূরপরাহত।

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.