বজ্রপাতের ঝুঁকিতে উড়োজাহাজ। সংগৃহীত ছবি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আকাশসীমায় সাম্প্রতিক ধারাবাহিক বজ্রপাতের আঘাতে একের পর এক আধুনিক উড়োজাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ১৫ দিনে দেশের আকাশসীমায় অবতরণের সময় দুই দফায় বিমানের দুটি এবং সর্বশেষ গত রবিবার (৭ জুন) ইজিপ্ট এয়ারের একটি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার বজ্রপাতের কবলে পড়ে জরুরি মেরামতের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাকে ফ্লাইট বাতিল, আকস্মিক উড্ডয়ন স্থগিত (এওজি) এবং মেরামতজনিত কারণে লাখ লাখ ডলারের বিশাল আর্থিক লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে।
উড়োজাহাজগুলো এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড’ (এওজি) বা সাময়িক উড্ডয়নের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সূচি চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডর নূর-ই-আলম বলেন, "আমাদের বিমানবন্দরের চারপাশে সর্বাধুনিক বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। ফলে রানওয়ে বা পার্কিং বেতে থাকা অবস্থায় বিমান বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম, সাম্প্রতিক প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাই ঘটেছে আকাশে অবতরণের সময়।"
এভিয়েশন প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্যমতে, গত ২৬ মে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজ বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় ৩ লাখ ডলার ব্যয়ে ১৫ দিন ধরে মেরামত করে সচল করা হয়। এর পরপরই বিমানের আরও একটি ড্রিমলাইনার অবতরণের সময় ইঞ্জিনে বজ্রপাতের আঘাত নিয়ে মাঠ পর্যায়ে চলে যায়, যা দীর্ঘ মেরামতের পর গত ৬ জুন পুনরায় চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। সর্বশেষ রবিবার আক্রান্ত হওয়া ইজিপ্ট এয়ারের ড্রিমলাইনারটির বডিতে তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহের কারণে প্রবেশ ও বহির্গমন চিহ্নসহ কালো দাগ এবং বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের মতো আধুনিক বিমানের প্রায় ৫০ শতাংশ কাঠামো তৈরি হয় কার্বন ফাইবার বা কম্পোজিট উপাদানে, যা পুরোনো দিনের অ্যালুমিনিয়ামের মতো দ্রুত বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না। ফলে বজ্রপাতের তীব্র বৈদ্যুতিক চার্জ কাঠামোতে ছড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে এক জায়গায় আটকে থেকে উচ্চ তাপ উৎপন্ন করে, যা বডির অভ্যন্তরীণ স্তর বিচ্ছিন্নকরণ বা 'ডিল্যামিনেশন' ঘটায়। বাইরে থেকে এই ক্ষতি সামান্য মনে হলেও উচ্চ আকাশে তা বায়ুর চাপে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বিধায় নিরাপত্তার স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে এগুলোর উড্ডয়ন স্থগিত করা হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক এয়ার কমোডর মঞ্জুর-ই-আলম বলেন, "উড়োজাহাজে বজ্রপাত প্রতিরোধে নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে এবং এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দেওয়া থাকে। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় আকাশে সরাসরি বজ্রপাতের মুখে পড়লে তা সম্পূর্ণ এড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না।"
এভিয়েশন খাতের সাবেক প্রকৌশলী আবু সুফিয়ান জানিয়েছেন, কম্পোজিট বডির অভ্যন্তরীণ ক্ষতি নির্ণয়ে ‘নন-ডেস্ট্রাকটিভ আল্ট্রাসনিক পরীক্ষা’র পর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সরাসরি নির্দেশনা অনুযায়ী তা মেরামত করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তিনি উল্লেখ করেন, বজ্রপাত পুরোপুরি এড়ানো অসম্ভব হলেও বিমানে কপার বা অ্যালুমিনিয়াম মেশ, উন্নত থ্রিডি ওয়েদার রাডার এবং লেজার আল্ট্রাসনিক টেস্টিং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
