চাকরির পরীক্ষা। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রায় পাঁচ লাখ পদ শূন্য পড়ে আছে, অন্যদিকে বাড়ছে কর্মহীন মানুষের দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল কর্মসংস্থানের অভাব নয়, বরং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতার এক নগ্ন প্রতিফলন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদই শূন্য। এর মধ্যে প্রথম থেকে নবম গ্রেডের (গ্রেড ১–৯) মতো নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই ফাঁকা রয়েছে প্রায় ৬৯ হাজার পদ। তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে গ্রেড ১৩ থেকে ২০ পর্যায়ে, যেখানে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার পদ শূন্য পড়ে আছে।
মাঠপর্যায়ে সেবা প্রদানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই পদগুলো বছরের পর বছর খালি থাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসনের সেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত কাজের চাপে একদিকে যেমন সরকারি কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৩ হাজারে, যা এক বছরের ব্যবধানে ৩ লাখ ৩০ হাজার বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সরকারি খাতের এই পাঁচ লাখ শূন্য পদ পূরণ করা গেলে বেকারত্বের এই হার অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল।
অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের মতে, শূন্য পদ পূরণের আর্থিক সক্ষমতা সরকারের থাকলেও বাস্তবায়নের গতি হতাশাজনক। দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে লাখো পরিবারের অর্থনৈতিক চিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত যোগদান পর্যন্ত কয়েক বছর সময় লেগে যায়। যদিও সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোবাশ্বের মোনেম দাবি করেছেন যে, নিয়োগের সময়সীমা সাড়ে তিন বছর থেকে কমিয়ে এক বছরে নামানো হয়েছে, তবুও সাধারণ গ্রেডভুক্ত পদগুলোর নিয়োগে এখনো বড় ধরনের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস সংস্কার এবং মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের নিয়োগে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার অভাব রয়েই গেছে।
শূন্য পদের এই পাহাড় আর বেকারের মিছিল একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো জনবল সংকটে ধুঁকছে, তখন শিক্ষিত তরুণদের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কেবল মেধার অপচয় নয়, বরং সামাজিক অস্থিরতারও ইঙ্গিত দেয়। দ্রুত নিয়োগ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের এই বৈপরীত্য দূর করা এখন সময়ের দাবি, অন্যথায় উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
বিষয় : সরকারি চাকরির খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
