× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

ঢাকায় ঘুরল গাড়ির চাকা, জনসমাগম সবখানে

ন্যাশনাল ট্রিবিউন প্রতিবেদক

২৪ জুলাই ২০২৪, ১৬:১৩ পিএম । আপডেটঃ ২৪ জুলাই ২০২৪, ১৬:১৩ পিএম

ঢাকার রাস্তায় বুধবার কারফিউ শিথিলের মধ্যে সব ধরনের গণপরিবহন চলেছে| ছবি—সংগৃহীত

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে প্রাণঘাতী সহিংসতা-সংঘর্ষ এবং কারফিউয়ের কারণে যে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তা কাটিয়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরল গাড়ির চাকা, পথে পথে দেখা গেল জনস্রোত, ছিল চিরচেনা যানজটও।

বুধবার কারফিউ শিথিলের সময়ে ঢাকার কোথাও গত কয়েকদিনের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ। আরও কিছু সড়ক আংশিকভাবে বন্ধ থাকলেও জনসমাগম দেখা গেছে ঢাকার সর্বত্র।

নজিরবিহীন নৈরাজ্যের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকার জনজীবন। একের পর এক হতাহতের ঘটনা ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।

শুক্রবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয় কারফিউ। এরপর মঙ্গলবার পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

বুধ ও বৃহস্পতিবার ঢাকায় ৭ ঘণ্টা কারফিউ শিথিলের কথা জানায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর সরকারি অফিস-আদালত খোলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত।

বুধবার কারফিউ শিথিলের মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিস চালু হওয়ায় এক সপ্তাহের অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে ঢাকা।

নগরবাসী বলছেন, গত কয়েকদিন কার্যত সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। কারফিউ শিথিল হওয়ায় জরুরি কাজগুলো সেরে নিচ্ছেন তারা।

দুপুরে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের একটি বেসরকারি ব্যাংকের সামনে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা সাহানা রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যাংকে তার ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা জমা দেওয়ার সময় ছিল রোববার। সহিংসতার কারণে টাকা জমা দিতে না পারায় দুঃশ্চিন্তায় পড়েছিলেন।

"সময়মত টাকা না দিলে জরিমানা কাটে। মারামারির কারণে বুধবার থেকেই বের হতে পারছিলাম না। অনলাইনেও একাউন্টে টাকা পাঠাতে পারছিলাম না। আজকে ব্যাংক খোলায় আসলাম।"

বুধবার সকালে কারফিউ শিথিলের সময় ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতালে এসেছেন বাবুল শেখ।

সাংবাদিকদের বাবুল শেখ বলেন, “স্ত্রীকে নিয়মিত চেকআপ করাতে হয়। কয়েকদিন আসতে পারিনি। তবে আজকে বের হলাম, অনেক রাস্তা বন্ধ ছিল; তাই অনেকটা পথ ঘুরে মহাখালী আসতে হয়েছে।”

সকালে মিরপুরের কালশী থেকে অফিসে আসার সময় গাড়ি সংকটে পড়ার তথ্য দিয়ে মহাখালীর এক সিএ ফার্মের কর্মকর্তা রাশেকুর রহমান রাশা বলেন, নিজে যানজটে না পড়লেও সহকর্মীদের এর ভোগান্তিতে পড়ার কথা শুনেছেন তিনি।

রাশেক বলেন, “আমার এক সহকর্মী নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া থেকে এসেছেন; রাস্তায় রাস্তায় সেনাবাহিনির চেকপোস্ট ছিল। তাই উনার আসতে অনেক সময় লেগেছে। মিরপুর-১০ নম্বর থেকে থেকে একজন এসেছেন। সাধারণত আসতে তার ৪০-৪৫ মিনিটে সময় লাগে, আজ সেখানে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছে।”

রাস্তাঘাট স্বাভাবিক মনে হলেও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়েই রাস্তায় চলেছেন তিনি।

রাশেক বলেন, “টুকটাক ভয় ছিল, রাস্তায় বের হলে কী হয়, না হয়! রাস্তাঘাট স্বাভাবিক থাকলেও এমন সব ঘটনা ঘটে গেছে মানুষের মধ্যে ভয় তো থাকবেই। আমাদের রোডের বাসও কম ছিল, গাড়িতে উঠতে কষ্ট হইছে।”

সরকারি চাকরিজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস অফিস শেষে মিরপুর-১২ নম্বর থেকে ফিরছিলেন মানিকদীতে।

সাংবাদিকদের বলেন, গত ৬ দিন বাসায় থাকতে হয়েছে, বিষন্নতায় ভুগছিলেন তিনি; ঘর থেকে বের হতে পেরে স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন।

“বাসায় থাকতে থাকতে মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছিল। আজকে অফিস করতে বের হলাম, ভালো লাগছে৷ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে মনে হচ্ছে৷ এখন আর আগের মত ভয় বা উৎকণ্ঠা নাই৷ মনে হয় না আর অসুবিধা হবে।”

নিকুঞ্জ-২ এলাকায় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে কাজ করেন মনজুরুল ইসলাম৷ বুধবার দুপুরে অফিসের কাজে মহাখালী ডিওএইচএসে যাচ্ছিলেন তিনি৷

মনজুরুল বলেন, “এ কয়েকদিন তো একেবারে লকডাউনের মত অবস্থা ছিল, এখন বের হয়ে ফ্রেশ লাগছে। এ কয়দিন যে ঝামেলা হইছে! আমাদের ভয়ও আছে! এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, আবার কখন ঝামেলা শুরু হয়ে যায়৷”

বুধবার দুপুরেই রাস্তায় মানুষের ভিড় ছিল বেশি। মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বাস দেখামাত্রই দৌড়ে এসে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কেউ কেউ বাসে ঝুলে যাচ্ছিলেন, কেউ উঠতে না পেরে বিকল্প বাহন খুঁজছিলেন।

তারা বলছিলেন, কারফিউ শুরু হয়ে গেলে যদি বাসায় ফেরা না যায়; সেই শঙ্কায় আছেন তারা।

গুলিস্তানে যেতে দুপুরে মহাখালীর আমতলী বাসস্টপে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী তাহমিনা আক্তার।

তিনি বলেন, “রাস্তায় গাড়ি কম; ভয়ও হচ্ছে যদি গাড়িতে উঠতে না পারি; তাহলে তো সময়ের মধ্যে ফিরতে পারব না। কারফিউয়ের সময় রাস্তায় থাকলে আবার কী হয়!

“সকাল থেকেই আমাদের কাজের একটা তাড়া ছিল, কাজ শেষ করে কত দ্রুত বাসায় ফিরতে পারব সে চিন্তা আমাদের সবার ছিল।”

এদিকে বিকাল ৪টা থেকে ঢাকার সড়কগুলোতে তীব্র যাটজট দেখা যায়। বিকাল ৪টায় কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠে হাসিনা বেগমের আমতলীতে আসতে সময় লেগে গেছে পৌনে ২ ঘণ্টা।

“আজকে রাস্তায় অসম্ভব জ্যাম। ভেবেছিলাম কারফিউ শুরুর আগেই বাসায় ফিরে যাব। কিন্তু এত বেশি জ্যাম, আমতলী পৌঁছাতেই অনেক সময় চলে গেল। আসলে অনেকদিন পর তো সবকিছু স্বাভাবিক হল, তাই রাস্তায় গাড়ির চাপ বেশি।”

মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা শান্তা ইসলাম কাজ করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, আর এরপর জারি করা কারফিউর কারণে ৯ দিন পর বাইরে বের হয়েছেন তিনি।

শান্তা বলেন, “এই কয়েকদিন বাজার করতে পারিনি। বাসায় খাবার শেষ। বাসার সামনে থেকে শুধু সবজি কিনে খেয়েছি। আজকে বেশ কিছু জরুরি কাজ শেষ করতে বেরিয়েছি। তবে রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম আর ভাড়াও অনেক বেশি।”

মহাখালী ডিওএইচএসের এক বায়িং হাউজে কাজ করেন আব্দুল আলিম, অফিসের কাজ শেষ করে দুপুরে বারিধারা থেকে অফিসে ফিরছিলেন তিনি।

আলিম বলেন, “রাস্তায় তুলনামূলক গাড়ি কম, তারপরও যানজট অনেক। সব মিলিয়ে মুভ করতে অসুবিধা হচ্ছে। ভয়ও লাগছে, কখন জানি আবার দুর্ঘটনা ঘটে যায়- এমন একটা আতঙ্কে আছি৷”

বুধবার ৭ ঘণ্টা কারফিউ শিথিল থাকায় ঢাকার সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা দেখা গেছে। বনানীর সড়কে আমড়া ও পেয়ারা ফেরি করে বিক্রি করেন রুবেল মিয়া। প্রায় ৯ দিন ধরে তার তেমন বিক্রি নেই।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আসলাম তার দোকানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে চকবাজারে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “বাচ্চাদের মাথার ব্যান্ড, কিছু খেলনা বিক্রি করে দিন চলি। কিন্তু আমার দোকানের মাল ফুরায় আসছিল। আজকে বের হইয়া কিছু মাল আনলাম। এখন কয়েকদিন আর চিন্তা করা লাগবো না।”

রুবেল বলেন, “এই কয়দিন যে ক্যামনে গেছে আমাদের, আল্লাহই জানেন। আজকে কিছু বেচা-বিক্রি হইছে। তাই ভালো লাগতেছে।”

গত শুক্রবার রাত ১২টা থেকে দেশে কারফিউ শুরু হওয়ায় ঢাকার বাইরে গিয়ে অনেকে আটকা পড়েছিলেন।

জরুরি কাজে গত বুধবার চাঁদপুরে যান মাছুম কামাল। দেশজুড়ে চলমান সহিংসতা আর করফিউর কারণে ঢাকায় ফিরতে পারছিলেন না তিনি। বুধবার সকালে কারফিউ শিথিলের সময় তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হন।

মাছুম কামাল বলেন, “হাইওয়েতে গাড়ির চাপ আছে। তবে এত বেশি জ্যাম নেই। এই কয়দিন তো রাস্তা একদম ফাঁকা ছিল, সুযোগ বুঝে সবাই বের হচ্ছেন আজকে।”

কোটা সংস্কারের দাবিতে জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই আন্দোলন চালিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা। তারা ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অবরোধ কর্মসূচির পর সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করলে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়।

এ অবস্থায় শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কারফিউ জারি করে সরকার। সেই সঙ্গে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী।

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, ছাত্রদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত এসব নাশকতা ঘটিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো।

বিষয় : কারফিউ

National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.