মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় বিজিবির পাহারা। ফাইল ছবি
মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানের দুর্গম পথ ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইয়াবার চোরাচালান চিরতরে বন্ধ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা, শক্তিশালী লাগেজ ও ভেহিক্যাল স্ক্যানার এবং ডগ স্কোয়াড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তসংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ১১টি সংযোগস্থলে স্থায়ী তল্লাশিচৌকি বসাতে ৩২১ জন পুলিশ সদস্যের পদ সৃষ্টি এবং যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো বাবদ ১২ কোটি ৯৮ লাখ ৫২ হাজার টাকার একটি বিশেষ প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। সীমান্ত পেরিয়ে পাহাড়ি পথ, পুরোনো সড়ক বা বিকল্প পথে শহরে মাদক পৌঁছানোর আগেই পাচারকারীদের ধরে ফেলার লক্ষ্যেই এই অভিনব প্রযুক্তিগত বলয় তৈরির রূপরেখা আঁকা হয়েছে।
সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ক্রমাগত অভিযান সত্ত্বেও দেশে ইয়াবার তীব্র বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে চলতি ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১ কোটি ৫১ লাখ ৩৪ হাজার ৯৪৫টি এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ৮১১টি ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে। উদ্ধার পাওয়া এই বিশাল পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক পাচার চক্রগুলো নিত্যনতুন রুট ব্যবহার করে কৌশলে সীমান্ত পার করছে।
কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্ত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রস্তাবটি রূপায়ন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) মো. নাজিমুল হক। তিনি বলেন, “কোনোভাবেই যেন দেশে ইয়াবা ঢুকতে না পারে—এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখেই আমরা পরিকল্পনাটি তৈরি করেছি। সন্দেহভাজন পাচারকারীদের চেকপোস্টে আটকানো হবে। খালি চোখে শনাক্ত করা না গেলেও আমাদের সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে এআই-নির্ভর ক্যামেরা মুহূর্তের মধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করবে। আর যানবাহন বা লাগেজে লুকিয়ে রাখা মাদক উদ্ধার করবে স্ক্যানার ও বিশেষ প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড।”
নজরদারির এই পুরো ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিভিত্তিক করতে প্রস্তাবিত ১১টি চেকপোস্টে ৩১টি ফেস রিকগনিশন এআই ক্যামেরা, ১৪০টি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা, ৬টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার (প্রতিটি ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা) এবং ৮টি বিশ্বমানের লাগেজ স্ক্যানার (প্রতিটি ৪৫ লাখ টাকা) স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিহ্নিত ইয়াবা কারবারি ও তাদের সহযোগীদের ছবি এআই সিস্টেমে পূর্বে থেকে আপলোড করা থাকবে, ফলে ওই ব্যক্তিরা তল্লাশিচৌকিতে প্রবেশ করা মাত্রই স্বয়ংক্রিয় সংকেত বেজে উঠবে।
প্রস্তাবিত ১১টি পয়েন্টের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী নজরদারিবলয় তৈরি করা হবে কক্সবাজার শহরের প্রবেশমুখ ও মেরিন ড্রাইভের শেষপ্রান্তে অবস্থিত ‘ভাঙ্গার মোড়’-এ। সেখানে একাই ৪২ জন পুলিশ সদস্য, ১টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার, ১টি লাগেজ স্ক্যানার, ৩টি এআই ক্যামেরা, ১৫টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ১টি ডগ স্কোয়াড মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া চকরিয়ার হারবাং, রামুর রাংকুট বৌদ্ধবিহার ও গর্জনিয়া, উখিয়ার কোর্ট বাজার এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বেইলি সেতু, সোনাইছড়ি ও বাইশারীর দুর্গম চাররাস্তার মোড়ের মতো পুরোনো ও অপ্রচলিত পাচার রুটগুলোতে ৩৩ জন করে পুলিশ সদস্য নিয়ে স্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত রূপরেখাকে দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “মাদকের একটি পথ বন্ধ হলে কারবারিরা বিকল্প পথ খোঁজে। সীমান্ত, পাহাড়ি ট্রেইল, রেলপথ কিংবা শহরে প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে সমন্বিত নজরদারির ঘাটতি থাকলে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব। তাই এই আধুনিক এআই প্রযুক্তির প্রস্তাবটি দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নে রূপ নেওয়া জরুরি।”
পুলিশ সদর দপ্তরে প্রেরিত এই প্রস্তাবটি বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমার সীমান্ত থেকে শুরু করে পর্যটন শহর কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলের মূল সড়কগুলোর প্রতিটিতেই সুরক্ষিত প্রযুক্তিগত প্রাচীর গড়ে উঠবে, যা দেশের সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন মাইলফলক হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
রিলায়েন্ট মিডিয়া
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
