জীবনের শেষ সম্বল ও নিজের উপার্জনে গড়া মিরপুরের কাফরুলের ছয়তলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে পঙ্গু এম মো. আলী। প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
রাজধানীর মিরপুরের কাফরুলে নিজের কঠোর পরিশ্রমে গড়া ছয়তলা বাড়ি হারিয়ে এখন উত্তরার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পঙ্গু ও বৃদ্ধ এম মো. আলী। এই সম্পত্তি দখল ও পারিবারিক বিরোধের জেরে বাবা-ছেলে এবং ভাইদের মধ্যে বর্তমানে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্ত নিয়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ছোট ছেলে ও তাঁর স্ত্রীর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখে জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী বৃদ্ধ এম মো. আলী জীবনের দীর্ঘ সময় মধ্যপ্রাচ্যে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কাফরুল এলাকায় এই ছয়তলা ভবনটি নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে তিনি একটি পোশাক কারখানাও গড়ে তুলেছিলেন, যা তাঁর অসুস্থতার পর বন্ধ হয়ে যায়। তিন বছর আগে প্যারালাইজড হয়ে শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ পঙ্গু হয়ে পড়ার পর থেকেই তাঁর ওপর পারিবারিক নির্যাতন শুরু হয়। বর্তমানে তিনি তাঁর বড় ছেলে ওয়াহিদ জুবায়েরের আশ্রয়ে উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় দিন কাটাচ্ছেন।
বৃদ্ধ মো. আলী বলেন, "আমার ছোট ছেলে এম এম মাহমুদ সাঈদ ও তার স্ত্রী ওয়াহিদা বেগম আমার গলায় ছুরি ধরে আমাকে নিজের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আমি এই বয়সে নিজের বাড়িতে নিরাপদে শান্তিতে ঘুমাতে চাই এবং যারা এই ঘটনার সাথে জড়িত, তাদের বিচার চাই।"
তিনি আদালতের এজাহারে আরও অভিযোগ করেন, ছোট ছেলে ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময় তাঁকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছে। যেখানেই তিনি আশ্রয় নেন, সেখানেই ফোনে ও সশরীরে এসে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বড় ছেলে তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধেও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
এদিকে, ছোট ছেলে এম এম মাহমুদ সাঈদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বর্তমানে ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাসরত মাহমুদ বলেছেন, "আমার বাবা তিন বছর আগে পঙ্গু হওয়ার পর থেকে বড় ভাই ওয়াহিদ জুবায়ের বাবাকে ভুল বুঝিয়ে আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। বড় ভাই মূলত বাবার সমস্ত সম্পত্তি একাই দখল করার উদ্দেশ্যে বাবাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। আমরা বাবাকে তাড়াইনি, এখনো একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া বাবা নিয়মিত পাচ্ছেন।"
বড় ভাই ওয়াহিদ জুবায়ের বলেন, "বাড়িটি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য মাহমুদ দীর্ঘদিন ধরে বাবার ওপর অমানুষিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। এমনকি তাকে কয়েকবার মেরে ফেলার চেষ্টাও করা হয়। নিরুপায় হয়ে আমি পঙ্গু বাবাকে আমার কাছে নিয়ে আসি, আর এই অপরাধে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে।"
এই পারিবারিক বিরোধের সূত্র ধরে বহিরাগত ভাড়াটিয়াদের জড়িয়ে আদালতে একাধিক পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের হয়েছে। বকেয়া বাড়ি ভাড়া দেড় লাখ টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ভাড়াটিয়া মো. কামাল শাহরিয়ার ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করেন মো. আলী। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত বছরের ১০ জানুয়ারি ভাড়াটিয়া কামাল শাহরিয়ার, তাঁর স্ত্রী ফৌজিয়া খাতুন ও ছেলে ফারহানের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রাবিউল আলম জানান, "তদন্তে ভাড়ার টাকা বকেয়া থাকার সত্যতা মিলেছে এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার দিন আসামিদের সঙ্গে থাকা বহিরাগত সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।"
পিবিআইয়ের এই অভিযোগপত্রের পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ভাড়াটিয়া কামাল শাহরিয়ার মালিকের বড় ছেলে ওয়াহিদ জুবায়েরের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন। কাফরুল থানা পুলিশ এই মামলায় কোনো সত্যতা না পেয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দাখিল করলেও, বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। গত ৩১ মার্চ সিআইডির এসআই মো. শফিউল্লাহ রায়হান বড় ছেলে ওয়াহিদ জুবায়েরের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
ওয়াহিদ জুবায়েরের অভিযোগ, "আমার ছোট ভাইয়ের আর্থিক প্রলোভনে ও পরামর্শে ভাড়াটিয়া এই মিথ্যা মামলা করেছে। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা চার্জশিট দিয়েছেন।" তবে এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শফিউল্লাহ রায়হান কোনো মন্তব্য দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান।
পারিবারিক ও আইনি এই চরম সংকটের মধ্যে পঙ্গু এই বৃদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর কষ্টার্জিত সম্পদের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্ন চিহ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ নাগরিকরা মনে করছেন, এই ঘটনা আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের এক নির্মম দৃষ্টান্ত। আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল একজন অসহায় বাবার অধিকার পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
