রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়া ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ বাসটিকে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সাহায্যে টেনে তুলছেন উদ্ধারকর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে গেছে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস। তবে বিগত মার্চ মাসের এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের জারি করা বাধ্যতামূলক নিয়ম মেনে ফেরিতে ওঠার আগেই বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়ায় এবার অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন ৩৮ জন যাত্রী। ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ প্রায় দুই ঘণ্টার প্রচেষ্টায় দুপুর ১২টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সাহায্যে বাসটি নদী থেকে টেনে তুলেছে।
আজ শুক্রবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে ৩ নম্বর ঘাটে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার পর বাসের চালক ও তার সহযোগীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে দৌলতদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন ও নৌপুলিশ নিশ্চিত করেছে, এই ঘটনায় কোনো যাত্রী নিখোঁজ বা হতাহত হননি।
যাত্রীদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নামিয়ে দেয় প্রশাসন
প্রত্যক্ষদর্শী ও বাসের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘাটে পৌঁছানোর পর নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যাওয়ার অনুরোধ করা হলে শুরুতে অনেকেই নামতে রাজি ছিলেন না।
দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুল আহাদ বলেন, "সবাই বাস থেকে নেমে ঘাটের পাশ দিয়ে হেঁটে আসছিলাম। কয়েকজন নামতে চাচ্ছিল না, পরে তাদেরকে অনেকটা জোর করেই বাস থেকে নামানো হয়। এরপর সামনে তাকিয়ে দেখি, আমাদের বাসটা চোখের পলকে তীব্র গতিতে পানিতে পড়ে গেল। আমরা যদি ভেতরে থাকতাম, তবে কেউই বাঁচতাম না।"
দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা জানান, "আমাদের নৌ-পুলিশ সদস্যরা ঘাটে কঠোর অবস্থানে ছিলেন এবং ফেরিতে ওঠার আগেই উপর থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে বাসটি যখন পানিতে পড়ে, তখন সেটি সম্পূর্ণ যাত্রীশূন্য ছিল।"
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’ নামের একটি ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিল। এ সময় ঘাটে নোঙর করে রাখা অন্য একটি ফেরির র্যামে সজোরে ধাক্কা খায় বাসটি। ধাক্কার তীব্রতায় চালক মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণ হারালে বাসটি পন্টুন থেকে ছিটকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় এবং চোখের পলকে তলিয়ে যায়।
পানিতে পড়ার পর বাসের চালক ও সহকারী সাঁতরে ভেসে উঠলে স্থানীয় ও ঘাটে কর্মরত শ্রমিকরা তাদের উদ্ধার করেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ-এর ডুবুরি দল। পরে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ অভিযানে যোগ দিয়ে দুপুর ১২টায় বাসটি জলমগ্ন অবস্থা থেকে ওপরে তুলে আনে।
রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, "আমরা অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে বাসটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। বাসের ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে জীবিত বা মৃত আর কাউকে পাওয়া যায়নি। কোনো পক্ষ থেকে কেউ নিখোঁজ থাকার দাবিও করা হয়নি।"
চলতি বছরের ২৫শে মার্চ দৌলতদিয়া ঘাটের এই একই পয়েন্টে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস ফেরির ধাক্কায় পদ্মা নদীতে পড়ে তলিয়ে গিয়েছিল। ঈদুল ফিতরের পর ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে নারী ও শিশুসহ ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান।
ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে প্রশাসন। এরপর থেকেই ফেরিতে ওঠার আগে ঘাট এলাকায় যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক করে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ। আজ সেই কড়াকড়ির কারণেই নিশ্চিত এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল ৩৮টি প্রাণ।
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, "গত মার্চের দুর্ঘটনার পর থেকেই আমরা ফেরিঘাটে পুলিশ ও প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি নিশ্চিত করেছিলাম। বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার এই কঠোর নিয়মের কারণেই আজকে আবারও একটি বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের প্রাণ রক্ষা পেল।"
দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি বর্তমানে হাইওয়ে ও নৌ পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। ঘাট এলাকায় সাময়িকভাবে যানবাহন পারাপারে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও বাসটি নদী থেকে তোলার পর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল ও যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। তবে এই ঘটনাটি ফেরিঘাটের পন্টুন ব্যবস্থাপনা এবং চালকদের ফিটনেস ও দক্ষতার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং ঘাটগুলোর অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফেরি ও বাসের চালকদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যেন এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
