যশোরের বেনাপোল সীমান্তের রঘুনাথপুর জিরো লাইনে বিজিবির কড়া পাহারা।
যশোরের বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক একদল ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) বড় ধরনের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে বিজিবি, যার ফলে দুই দেশের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত রবিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই তৎপরতার পর বর্তমানে রঘুনাথপুর ও সাদীপুর সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা জিরো লাইনের কাছে একদল ব্যক্তি আটকা পড়ে আছেন বলে জানা গেছে।
যশোরের রঘুনাথপুর ক্যাম্পের বিজিবি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল আলম খান বলেন, "গোয়েন্দা তথ্য ও নজরদারি থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম যে বিএসএফ আনুমানিক ১০০ জনকে সীমান্তের ওপারে জড়ো করেছিল। তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে বিজিবি সতর্ক অবস্থান নেয়। এর ফলে ওই ব্যক্তিরা নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। আমরা কাউকে অবৈধভাবে জিরো লাইন ক্রস করতে দেবো না।"
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, পুশ-ইনের শিকার দলটিতে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, সীমান্তের সীমানা চৌকির কাছের ঝোপঝাড় ও গাছপালার আড়ালে এসব মানুষকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তাদের সরাসরি খালি চোখে দেখা না গেলেও, জিরো লাইনের কাছে তাদের ব্যবহৃত পোশাক ও দৈনন্দিন নানা দ্রব্যাদি পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সম্প্রতি বিজেপি সরকার গঠনের পর ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ দমনে ধরপাকড় ও হোল্ডিং সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা এসেছে। ভারতের এই ‘পুশ-ব্যাক’ নীতিই এখন বাংলাদেশ সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ আতঙ্ক তৈরি করছে।
সীমান্তের এই উত্তেজনা প্রসঙ্গে মঙ্গলবার ঢাকায় সচিবালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে কড়া বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, "বর্ডারে আমাদের বিজিবি সম্পূর্ণ অ্যালার্ট আছে। আমরা যে কোন ধরনের ইল্লিগ্যাল পুশ ইন বা পুশ ব্যাকের তীব্র বিপক্ষে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে কোনো তালিকা পাঠায়, তবেই কেবল আইন অনুযায়ী রিপ্যাট্রিয়েশন (স্বদেশ প্রত্যাবর্তন) প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তালিকা আমরা পাইনি।"
এদিকে, ঢাকার অনড় অবস্থান ও বিজিবির কঠোর প্রতিবাদের মুখে সোমবার বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে একটি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকে বিএসএফ পুশ-ইনের সব অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টতা সরাসরি অস্বীকার করেছে এবং এটিকে একটি ‘রুটিন বৈঠক’ বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, ভারতের সীমান্ত কর্মকর্তারাও পেট্রাপোল বা অন্য কোনো সীমান্ত দিয়ে লোক পাঠানোর খবর ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
বিএসএফের এই অস্বীকৃতির মধ্যেই সীমান্তে হাহাকার ও মানবিক সংকটের চিত্র উঠে এসেছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বেনাপোল সীমান্তে আসা নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি জানান, ওপারে আটকে থাকা দলের মধ্যে তাঁর বৃদ্ধ পিতাও রয়েছেন, যিনি পাঁচ বছর আগে চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে আর ফিরতে পারেননি। নজরুলের দাবি, নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে তাঁর পিতা ভিডিও কলে জানিয়েছেন যে দলটিতে প্রায় ৬০ জনের মতো মানুষ ছিল এবং বিজিবির নজর এড়িয়ে ইতিমধ্যে কিছু মানুষ ‘পকেট রুট’ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।
তবে অনুপ্রবেশের এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বিজিবির যশোর দক্ষিণ-পশ্চিম জোন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান জানান, গণমাধ্যমের খবর এবং মাঠপর্যায়ের রিপোর্টের ভিত্তিতে সীমান্ত নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে এবং একজনকেও অবৈধভাবে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বেনাপোলের সাদীপুর গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন বলেন, এই বন্দর এলাকায় দুই দেশেরই কড়া নজরদারি থাকে, তাই এখানে পুশ-ইনের এমন প্রকাশ্য চেষ্টা সত্যিই নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক।
উল্লেখ্য, শুধু যশোর নয়, এর আগে সাতক্ষীরা এবং গত এক বছর ধরে খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর সীমান্ত দিয়েও লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়েছে ভারত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্তমান শুভেন্দু অধিকারী সরকারের অনমনীয় মনোভাবের কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা স্থায়ীভাবে জোরদার করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
