যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পিএইচডি গবেষণারত অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার মেধাবী শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। ছবি: পরিবারের সৌজন্যে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পিএইচডি গবেষণারত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে আটলান্টিকের দুই পাড়েই। হত্যাকাণ্ডের শিকার বৃষ্টির মরদেহ এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে উদ্ধার করতে পারেনি স্থানীয় পুলিশ। দীর্ঘ এক দশকের কঠোর পরিশ্রমে গড়া এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের এমন বিয়োগান্তক পরিণতির পর পরিবারের এখন একটাই আকুতি—মেয়ের নিথর দেহটি যেন অন্তত একবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী বৃষ্টি গত ১৭ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। একই ক্যাম্পাস থেকে নিখোঁজ হন আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন। গত শুক্রবার লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করার পর বৃষ্টির খোঁজে তল্লাশি জোরদার করে হিলসবরো কাউন্টি পুলিশ। তল্লাশি অভিযানে লিমনের কক্ষ থেকে একটি দেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়েছে, যা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার আগে পুলিশ এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চিত করেনি। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মাদারীপুরের মেধাবী সন্তান নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির শিক্ষাজীবন ছিল সাফল্যে মোড়ানো। মিরপুরের নাহার একাডেমি থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। বুয়েটে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নকালেই ২০২৫ সালের আগস্টে পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন আকন, যিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত, অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “মেয়েটাকে আমি শেষবারের মতো দেখতে চাই। বৃষ্টির মা আর ভাই সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। আমাদের এখন আর কোনো চাওয়া নেই, শুধু ওর মরদেহটা যেন ফিরে পাই।”
মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নে বৃষ্টির পৈতৃক গ্রামে এখন শোকের মাতম। বৃষ্টির চাচা দানিয়াল আকন বলেন, “বৃষ্টি আমাদের এলাকার গর্ব ছিল। পড়াশোনায় এত ভালো মেয়েটা এভাবে চলে যাবে, কেউ মানতে পারছে না। আমরা খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।” কূটনৈতিক তৎপরতা ও আইনি প্রক্রিয়া
বৃষ্টির পরিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দূতাবাস এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার জানিয়েছেন, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতা করবে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
যে বৃষ্টির হাত ধরে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়েছিল একটি পরিবার, আজ সেই বৃষ্টির অবশিষ্টাংশ পাওয়ার অপেক্ষায় কাটে তাদের নির্ঘুম রাত। এক অমোঘ শূন্যতা আর হাহাকার এখন মিরপুরের সেই ঘরটিতে, যেখানে বৃষ্টির সাফল্যের সনদগুলো এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর হয়তো মিলবে আইনি প্রক্রিয়ায়, কিন্তু বৃষ্টির মা-বাবার হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো বিচার বা সান্ত্বনায় কি মুছে যাবে?
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
