বজ্রাঘাতের দৃশ্য। ফাইল ছবি
প্রকৃতি যখন রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় অন্নদাতার। শনিবার সাতসকালে হাসিমুখে সোনালি ফসল ঘরে তুলতে যারা হাওরের জমিতে নেমেছিলেন, দুপুরে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে তাদের অনেকেই ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। দেশের ছয় জেলায় বজ্রপাতের পৃথক ঘটনায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ৯ জনই ছিলেন কৃষক। প্রাণ হারিয়েছেন দুই জেলে ও এক কলেজ শিক্ষার্থীও। এই আকস্মিক মৃত্যু দেশের হাওরাঞ্চলসহ কৃষি জনপদগুলোতে শোকের কালো ছায়া নামিয়ে এনেছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটেছে সুনামগঞ্জে। জেলার চার উপজেলায় ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ জন। এর মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলার রহমত উল্লাহ (১৫) ছিলেন বাদশাগঞ্জ কলেজের ডিগ্রির শিক্ষার্থী। বাড়ির পাশে ধান শুকাতে গিয়ে তিনি প্রকৃতির এই রোষের শিকার হন। এছাড়া দিরাইয়ের বরাম হাওর ও জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন চার কৃষক। হাওরে এখন বোরো ধান কাটার মহোৎসব চলার কথা থাকলেও, সেখানে এখন বিরাজ করছে স্বজনহারাদের আর্তনাদ।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ছোট শালমারা বিলে মাছ ধরার সময় বজ্রাঘাতে নিহত হয়েছেন মিলন রায় ও আবু তালেব নামের দুই জেলে। এ সময় বজ্রপাতে আরও সাত জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিলের ধারে মাছ ধরা দেখতে আসা এক দম্পতিও এই বজ্রপাতে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর ও গফরগাঁওয়ে ধান কাটা এবং নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মৃত্যু হয়েছে দুই কৃষকের। অন্যদিকে নেত্রকোনার আটপাড়ায় ধলার হাওরে ধান কাটার সময় ষাটোর্ধ্ব কৃষক আলতু মিয়া বজ্রাঘাতে মারা যান। তার শরীর ঝলসানো অবস্থায় জমিতে পড়ে থাকতে দেখেন সহকর্মীরা। আটপাড়া উপজেলা প্রশাসন নিহতের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জেও একই চিত্র। নবীগঞ্জের মমিনা হাওরে বর্গা নেওয়া জমিতে নিজের ছেলের সাথে ধান কাটছিলেন সুনাম উদ্দিন (৫৫)। কাটা ধান ছেলেকে দিয়ে বাড়ি পাঠানোর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান তিনি। করিমগঞ্জের বড় হাওরেও ধান কাটার সময় প্রাণ হারিয়েছেন হলুদ মিয়া (৩৭) নামে এক কৃষক।
প্রতি বছরই বাংলাদেশে কালবৈশাখী মৌসুমে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরিসংখ্যান বলছে, বজ্রপাতে নিহতদের সিংহভাগই কৃষক, যারা খোলা মাঠে কাজ করার সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পান না। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বজ্রপাতের হার ও তীব্রতা দুটোই বেড়েছে। হাওরাঞ্চলে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা না গেলে প্রতি বছর সোনালি ফসল ঘরে তোলার মৌসুমে এই রক্তের দাগ মোছা সম্ভব হবে না। অকালপ্রয়াত এই ১২টি প্রাণ কেবল সংখ্যা নয়, বরং ১২টি পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তির চিরবিদায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
