× প্রচ্ছদ জাতীয় রাজনীতি অর্থনীতি সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন ফিচার প্রবাস সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

কুষ্টিয়ায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ‘পীর’কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা

ন্যাশনাল ট্রিবিউন প্রতিবেদক

১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:১৬ পিএম । আপডেটঃ ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:২৩ পিএম

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছে শামীম রেজার আস্তানা। ভাঙচুর শেষে গান-বাজনার সেই ঘরে ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫০) নামে এক ‘পীর’কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর গ্রামে তার আস্তানায় কয়েক শ মানুষ অতর্কিত হামলা চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। হামলার সময় আস্তানার পাকা ঘরে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। দীর্ঘ আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই তাণ্ডবে পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও জনস্রোতের কাছে তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ১৮ মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, শতাধিক মানুষ স্লোগান দিতে দিতে পাকা সড়ক দিয়ে দ্রুত হেঁটে আস্তানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আস্তানায় পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। লাঠিসোঁটা, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে একদল মানুষ ঘরে ঢুকে শামীম রেজাকে নির্মমভাবে কোপাতে ও পিটাতে থাকে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগের একটি বিতর্কিত ভিডিও শুক্রবার সকাল থেকে পুনরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শনিবার সকালে আস্তানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে ‘আবেদের ঘাট’ এলাকায় স্থানীয়রা জড়ো হয়ে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। দুপুর আড়াইটার দিকে জোহরের নামাজ শেষ হতেই বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার মানুষ আস্তানায় হামলে পড়ে।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, দুপুর নাগাদ তিনজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে শামীম রেজার অবস্থা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তার শরীরে কোপানোর একাধিক গভীর ক্ষত ছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান। হামলায় আহত অপর এক নারী ও পুরুষ বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “যে ভিডিওটি কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা, সেটি অনেক আগের। কিন্তু নতুন করে তা ছড়িয়ে দেওয়ায় এলাকার মানুষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।” জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান জানান, প্রায় সহস্রাধিক মানুষ আস্তানার পেছন দিকের বাঁশবাগান দিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

শামীম রেজার বিরুদ্ধে এর আগেও ২০২১ সালে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং তিনি কারাবরণ করেছিলেন। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পুনরায় আস্তানায় গান-বাজনা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

শামীম রেজা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমকম সম্পন্ন করার পর তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। পরবর্তীতে তিনি সংসার ত্যাগ করে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন। ২০১৮ সালে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে পৈতৃক জমিতে এই আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০২১ সালে এক শিশুর মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফন করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি প্রথম আলোচনায় এসেছিলেন।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ঘটনা গ্রামীণ জনপদে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা ও সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার বদলে উন্মত্ত জনতার তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ড কেবল অরাজকতাই ডেকে আনে। বর্তমানে এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও ভীতি ও উত্তজনা বিরাজ করছে। কারা এবং কেন পুরানো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা উসকে দিয়েছে, তা নিরূপণ করাই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর। ছবি: সংগৃহীত



National Tribune

সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন

যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574

ই-মেইল: [email protected]

ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 National Tribune All Rights Reserved.