নিহত সোহাগী জাহান তনু। ফাইল ছবি
দীর্ঘ দশ বছরের জমাটবদ্ধ অন্ধকার চিরে অবশেষে আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও স্পর্শকাতর এই মামলায় প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন হিসেবে সাবেক তিন সেনাসদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে উত্থাপন করেছে তদন্তকারী সংস্থা। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের এই আইনি পদক্ষেপ তনুর পরিবার ও সচেতন নাগরিকদের মনে এক দশকের বিচারহীনতার গ্লানি মুছে ন্যায়বিচারের নতুন আশা সঞ্চার করেছে।
সোমবার বেলা ১১টায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে পিবিআই-এর তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্তের স্বার্থে তিনি তিন সাবেক সেনাসদস্য—সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহীন আলমের ডিএনএ প্রোফাইল তনুর পোশাকে পাওয়া নমুনার সাথে মিলিয়ে দেখার আবেদন জানান। আদালত এই আবেদনে সম্মতি প্রদান করেছেন।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ সাত বছর সেই ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে সন্দেহভাজনদের নমুনা মেলানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার এই পদক্ষেপকে মামলার ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে ঝোপের ভেতর থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ অস্পষ্ট থাকলেও ডিএনএ পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত স্পষ্ট হয়। গত ১০ বছরে থানা পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি পর্যায়ক্রমে তদন্ত করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযুক্তরা ঘটনার সময় কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে তাঁরা অবসরে আছেন। তনুর বাবা ইয়ার হোসেনের দাবি, অভিযুক্তদের তালিকায় সৈনিক শাহীনের পরিবর্তে ‘সৈনিক জাহিদ’ নামে অন্য একজন যুক্ত ছিলেন। তাঁর মতে, ঘটনার সময় সার্জেন্ট জাহিদ ও তাঁর স্ত্রীকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
আদালতে নাম প্রকাশের পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তনুর মা আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, "আমার মাইয়াডার ওপর যে পাশবিক নির্যাতন হইছে, আল্লাহ যেন মৃত্যুর আগে তার বিচারডা আমারে দেখায়। সার্জেন্ট জাহিদের নাম কতবার কইছি, কেউ শুনে নাই। এহন আদালতে নাম গেছে, আমি বিচার চাই। আইন যদি সবার লাইগ্যা সমান হয়, তবে আমি বিচার পাইয়াম।"
তনুর ভাই আনোয়ার হোসেনের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে শঙ্কার সুর। তিনি জানান, তারা কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়, বরং নির্দিষ্ট অপরাধীদের বিচার চান। কোনো ‘অদৃশ্য চাপে’ যেন এই আশার আলো আবার নিভে না যায়, সেটাই এখন পরিবারের প্রধান উদ্বেগ।
কুমিল্লার সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ ২০১৭ সালেই নেওয়া উচিত ছিল। অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়ের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘অদৃশ্য চাপ’ উপেক্ষা করে তিনজনের নাম সামনে আসা তদন্তের জন্য ইতিবাচক। এটি প্রমাণ করে যে অপরাধী যেই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।
তনু হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। এক দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অশ্রুভেজা আর্তনাদের পর ডিএনএ পরীক্ষার এই নতুন উদ্যোগ যদি প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারে, তবেই কলঙ্কমুক্ত হবে বিচার বিভাগ। তনুর পরিবারের এই 'আশার আলো' যেন পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারে রূপ নেয়, এখন সেই প্রতীক্ষায় পুরো দেশ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
