ঢাকার পরিকল্পিত পাতাল ও উড়াল মেট্রোরেল পথের নির্মাণ ব্যয় নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর যানজট নিরসনে স্বপ্নের মেট্রোরেল এখন বাস্তব। তবে এই সাফল্যের পিঠে চেপে বসছে ঋণের বিশাল বোঝা আর অস্বাভাবিক ব্যয়ের পরিসংখ্যান। সরকারের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণ বলছে, ঢাকার নতুন দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে যে ব্যয় হতে যাচ্ছে, তা চলমান উত্তরা-মতিঝিল (লাইন-৬) প্রকল্পের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। জাইকার কঠিন শর্ত আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর রহস্যজনক ‘যোগসাজশে’র কারণে এই ব্যয়ের অঙ্ক ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় ঠেকেছে, যা প্রকল্প দুটির ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্তমানে সচল উত্তরা-মতিঝিল রুটে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অথচ নতুন দুই পথ—এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর ও পূর্বাচল) এবং এমআরটি লাইন-৫ (হেমায়েতপুর-ভাটারা)—নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি খরচ ধরা হচ্ছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় দুই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের জমা দেওয়া দরপত্র অনুযায়ী বর্তমানে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে খরচ বাড়ছে প্রায় ৯৭ শতাংশ।
ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে ঋণদাতা সংস্থা জাইকার কঠিন প্রকৌশলগত শর্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানান, জাইকার শর্তের কারণে দরপত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে কেবল জাপানি ও হাতেগোনা কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এই বিশাল কর্মযজ্ঞে অংশ নিতে পারছে।
তদন্তে দেখা গেছে, লাইন-৫ (উত্তর)-এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজে জাপানি প্রতিষ্ঠান ‘শিমুজি করপোরেশন’ এবং ‘তাইসি-স্যামসাং’ (যৌথ) কনসোর্টিয়ামের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির এক অদ্ভুত চিত্র ফুটে উঠেছে। একটি প্যাকেজে শিমুজি সর্বনিম্ন দরদাতা হলে অন্যটিতে সর্বনিম্ন হচ্ছে তাইসি-স্যামসাং। ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা একে ‘স্পষ্ট যোগসাজশ’ হিসেবে সন্দেহ করছেন। বিশেষ করে একটি প্যাকেজে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৩৯১ শতাংশ বেশি দাম হাঁকানো হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সামছুল হক এই অস্বাভাবিক ব্যয়কে ‘বিপজ্জনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “প্রতিযোগিতাহীন এই প্রক্রিয়ায় বিপুল ব্যয়ের বোঝা চাপলে দেশ দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। নতুন সরকারের উচিত ঋণের শর্ত পরিবর্তন করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যয় কমানো।”
এদিকে, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিপূর্বে মেট্রোরেলের পাশাপাশি মোহাম্মদপুর ও বনানীকে যুক্ত করে সাশ্রয়ী ‘মনোরেল’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এখন দেখার বিষয়, ঋণের ফাঁদে পড়া এই মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় কমাতে নতুন সরকার জাইকার শর্ত পুনর্বিবেচনা করে কি না।
ডিএমটিসিএল ইতিমধ্যে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বর্তমান দরে প্রকল্প বাস্তবায়ন অসম্ভব। যাত্রী ভাড়ার ওপর চাপ কমাতে এবং ঋণের ঝুঁকি এড়াতে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন এখন সময়ের দাবি।
বিষয় : গণপরিবহন মেট্রোরেল বিশেষ সংবাদ সরকার জাইকা উন্নয়ন প্রকল্প ঢাকা ঋণ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. আলী হোসেন
যোগাযোগ: +880244809006 ,01922575574
ই-মেইল: [email protected]
ঠিকানা: ২২০/১ (৫ম তলা), বেগম রোকেয়া সরণি, তালতলা, আগারগাঁও, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭
© 2026 National Tribune All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
