অর্থনীতির অন্যতম বিষফোড়া হলো মূল্যস্ফীতি, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এতে সমাজের দৈনিক মজুরিতে আয়-রোজগার করা মানুষের পণ্য কিনতে বেগ পেতে হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে করোনাভাইরাস ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক ও জাতীয় রপ্তানি প্রবাহ কমে যায়, কমে যায় রেমিট্যান্স প্রবাহও। এর ফলে আমদানির জন্য ডলারের ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকা ছাপাতে হয়েছে। এর প্রভাবে মুদ্রাস্ফীতির লাগামহীন উল্লম্ফন পরিলক্ষিত হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও অস্বাভাবিক বেড়ে যাচ্ছে।
এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৫.৫৯ শতাংশ, যা ২০১৮ সাল থেকে ০.০৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়ায় ৫.৬৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সাল থেকে ০.১ শতাংশ হারে বেড়েছে। আবার ২০২১ সালে মুদ্রাস্ফীতি ০.১৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৫৫ শতাংশে।
করোনাভাইরাসের কারণে ২০২২ সালে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৭.৭ শতাংশ, যার রেশ ধরে মুদ্রাস্ফীতির ক্রমবর্ধমান ধারা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়ায় ৯.৪ শতাংশে, যা বর্তমানেও ৯ শতাংশের বেশি।মুদ্রাস্ফীতির তিনটি মূল প্রভাবক হচ্ছে– সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা, আর্থিক নীতি ও আন্তঃবাজার গতিপ্রবাহ। গৃহস্থালি যেসব পণ্য উৎপাদন হয়, তা ভোক্তার কাছে সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে পৌঁছাতে খরচ বেড়ে যায়। কিছু সংখ্যক লোক বেশি মুনাফার আশায় বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের ইচ্ছায় বাজারের দাম নির্ধারিত হয়। ফলে উৎপাদনকারীরা ন্যায্য অর্থ না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিকই লাভবান হচ্ছে। সম্প্রতি ডিম, পেঁয়াজ, গোলআলু, চালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেগতিকভাবে বেড়ে চলেছে।
উদাহরণস্বরূপ, রমজান উপলক্ষে আমদানি করা প্রতি কেজি খেজুরে খরচ হয় ১০৫ থেকে ১১০ টাকা; কিন্তু বাজারে খেজুরের দাম অন্তত ৪৫০ টাকা ধরে বিক্রি হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার পদক্ষেপ নিলেও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে মানুষের পণ্য ভোগ করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। নতুন টাকা ছাপানো, মাত্রাতিরিক্ত ঋণখেলাপি ও রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে দেশের রিজার্ভ কমে যায়। এর ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি কমানোর জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ কার্যকরের চেষ্টা চলছে। যার মধ্যে একটি হলো, সুদের হার বাড়িয়ে বাজার থেকে অর্থ সরবরাহ কমানো। এর ফলে আমদানীকৃত এবং দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাজার ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।